“সিরিয়াসলি দোস্ত, সাদিয়া তোরে শেষ পর্যন্ত ন্যুড পাঠাইছে তাইলে?”“পাঠাবেনা মানে?” আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে সায়েম। “আমি হইতাছি কলেজের ছাত্র সংগঠনের নিবেদিত প্রাণ নেতা। বড়ভাইয়েরা আমার কাজে কর্মে এতটাই খুশি যে ঐদিন আমারে ডাক দিয়া কইছে পরের বছর নাকি সভাপতি হিসাবে আমারেই তাগো প্রথম পছন্দ। তাইলে চিন্তা কর একবার, আমার মত আপকামিং নেতারে সাদিয়া ন্যুড পাঠাবে না তো কি তোগো মত আম পাবলিকরে পাঠাবেরে হারামজাদা?”“তাও বটে। তোরেই তো পাঠাবে।” সায় দেই আমরা।নিজের বয়ান তখনও দিয়ে চলে সায়েম, “সাদিয়ার লগে রিলেশনের পর থেকে গত দুইটা মাস দৈনিক আমি নিজ দায়িত্বে তাঁরে মোটরসাইকেলে করে কলেজে দিয়া আসছি। আমার ভয়ে এই কয়দিন পাড়ার একটা পোলাও তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহস পায়নি। গত সপ্তাহে মনে আছে হিরু নামের একটা পোলা তাঁরে প্রপোজ করছিল? সাদিয়ার খালি আমারে এই কথাটা কইতে দেরি হয় নাই আমি লগে লগে হিরু পোলাটার দুই ঠ্যাং ভাঙ্গে হাতে ধরার দিছি। এখনও ঐ পোলায় হাসপাতালের বিছানায় পড়ে আছে।”“জিনিসটা কি তোর মোবাইলেই আছে নাকি? প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে জিজ্ঞেস করে মারুফ। “থাকলে একটু আমাগোরেও দেখা না। আগের বার তো মুন্নির ন্যুড দেখাইলিই না। তোরে এত করে রিকুয়েস্ট করলাম তুই সালা একা একা মজা নিলি। এইবার কিন্তু ঐসব করলে চলবেনা।”সায়েম হাসে, “দেখামু। কিন্তু বিনিময়ে কি খাওয়াবি আমারে?” আমরা একসাথে বলে উঠি, “বিরিয়ানি।” কলেজের জাতীয় ক্রাশ সাদিয়ার নগ্ন ছবি দেখার জন্য এটুকু স্যাক্রিফাইস আমরা করতেই পারি।“তোগো শেয়ার ইট অন কর।” পকেট থেকে ছাত্রনেতা কালাম ভাইর দেওয়া আইফোনটা বের করে সায়েম। আমরাও নিজ নিজ মোবাইলের শেয়ার ইট চালু করি। সায়েম পাঠাতে শুরু করে ভিডিওগুলো, ঠিক তখনি আচমকা বাঁধা দিয়ে বলে উঠে মারুফ, “ঐ খাড়া এক মিনিট। দেখ তো ঐ বলদটা এইদিকে আইতাছে না।?” আমরা তাকালাম রাস্তাটার ওদিকে, “হো রাতুলই তো। ঐ বলদটা এই সন্ধ্যার টাইমে এইদিক আসে কি করতে? ওরে তো নাকি সন্ধ্যা বেলা বাইরে বাইর হইলে আম্মু বকে।”মারুফ সতর্ক গলায় বলে, “শুন ওরে কিন্তু এইসব ভিডিও দেখাইস না। ঐ সালায় একটু তার চিড়া আছে। কোন সময় কি করে ঠিক নাই। ”“আরে ধুর বাল কে কইল তোরে।” প্রতিবাদ করে বলি আমি। “রাতুল হইতেছে দুনিয়ার বলদ। ওরে তুই যা কইবি ও সেইটাই বিশ্বাস করবে।তগো মনে আছে না সেইদিনের ঘটনাটা? বলেই তাদের দুজনের দিকে তাকাই আমি। সায়েম জিজ্ঞেস করে, “কোন ঘটনাটা?”“আরে তুই ঐদিন ছিলিনা।” বলেই মারুফের দিকে তাকাই আমি, “মারুফ তুই তো ছিলি ঐদিন মনে আছে না? ঐযে রাতুলরে যে গিয়া ফাইজলামি করে কইলাম, রাতুল জানিস তোকে না সাদিয়া পছন্দ করে। তোর উপর ক্রাশ খাইছে মেয়েটা। কিন্তু তোকে লজ্জায় সে বলতে পারেনা । এইটা শুইনা রাতুল কি রিয়েকশনটা দিলো মনে আছে না?“হো বলদে ধইরাই নিছিল ওরে মনে হয় সত্যি সত্যি সাদিয়া পছন্দ করে। কুন লেভেলের বোকাচোদা হইলে মানুষ এইটা বিশ্বাস করে।”“বলদটারে খালি সেইদিন কইলাম, “শুন রাতুল, সাদিয়া তোর সাথে আজকে দেখা করতে চাইছে। মনে হয় তোকে প্রপোজ করবে। তুই এক কাজ কর, ভালো একটা শার্ট আর প্যান্ট পরে বিকাল বেলা সাদিয়ার বাড়ির সামনে চলে যা। ওমা এইটা কইতে দেরি নাই বলদে সত্যি সত্যি গিয়া শার্ট প্যান্ট পরে সাদিয়ার বাড়ির সামনে যায় হাজির।” এটুকু বলেই থামলাম আমি। মারুফ ততক্ষণে হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। “হো দোস্ত হালায় আছিল লেভেল ছাড়া বোকাচোদা, সত্যি সত্যি গিয়া সাদিয়ার বাড়ির সামনে সন্ধ্যা পর্যন্ত খাঁড়ায় আছিল।” বলে আবারও পেট চেপে হাঁসতে থাকে সে। আমাদের হাসিতে যোগ দেয় সায়েমও। কোন মতে হাসি চাপিয়ে সে বলে, “তারপর কি হইল কো না।” মারুফ আমার দিকে আঙ্গুল তুলে, “ওরে কইতে কো। আমি হাসি থামাইতে পারতাছিনা।” বলেই সে আবারও হাঁসতে শুরু করে।আমি কোন মতে নিজের হাসিটা থামাই। “শুন তারপর কি হইল বলি। ঐ বলদটা গিয়া সাদিয়ার বাড়ির সামনে সেই যে বইছে তো বইছেই উঠার আর কোন নাম নাই। এইদিকে মাগরিবের আজান দিয়া দিলো। সাদিয়ার বাপে ঐ সময় মসজিদে যাবার জন্যে বাইর হইছে। রাতুলরে দেইখা জিগায়, বাবা তুমি দেখি সেই বিকেল থেকে এখানে বসে আছো? ব্যাপারটা কি বল তো? কাউকে খুঁজছ? জবাবে রাতুল কি কয় জানোস?”“কি কয়?”“রাতুলে কয়, আঙ্কেল আপনি কি সাদিয়ার আব্বু। সাদিয়াকে কি একটু ডেকে দেওয়া যাবে? ওর সাথে একটু কথা ছিল। আমাকে আজকে ও প্রপোজ করবে তো।”“কস কি? তারপর তারপর?” কৌতূহলী হয়ে উঠে সায়েম। তার ভিডিওটা ততক্ষণে পুরোটাই শেয়ারইট দিয়ে আমার মোবাইলে চলে এসেছে। আমি মোবাইলটা পকেটে ঢুকিয়ে বললাম, “সাদিয়ার বাপরে তো জানোসই হালায় কুন লেভেলের কুড়া। বলদাটার কানের নিচে দিছে বসায় একটা থাপ্পর। তারপর কান ধরে টানতে টানতে তার বাপের কাছে গিয়া বিচার দিছে। ঐ জায়গায় গিয়া আবার আরেক দফা মাইর খাইছে। তারপর থেইকা বলদা চোদায় আর জীবনেও সাদিয়ার নাম মুখে নেয়নাই।” “এই তাইলে কাহিনী।” বলে সায়েম। “আয় চল ঐ হালার লগে আরেকটা মজা লই। ডাক তো ওরে।”আমি ডাকি রাতুলকে,”ঐ রাতুল। ঐ সালা বলদ। কি করস ঐখানে। এইদিক আয়।”রাতুল এগিয়ে আসে রোবটের মত। তার মুখ হাসি হাসি। “কিরে তুই সন্ধ্যার পরে বাইরে কেন? যা বাসায় যা। আম্মু বকবে না?” খানিকটা ধমকের সুরে বলি আমি।“আজকে আম্মুকে বলে বের হইছি তো ঐজন্য কিছু বলবেনা।”“ওরে বাপরে। ভোদাই দেখি আজকে বীরপুরুষ হইছে।”“আসলে আমি একটা টাইম মেশিন বানাচ্ছি তো। ইউটিউব দেখে দেখে বানাতে শিখেছি। এজন্য আমি সুপারগ্লু কিনতে দোকানে এসেছি।”রাতুলের এসব বাচ্চামি দেখে আর বোকা বোকা কথা শুনে আমার আবার হাসি পায়। আমি কোনমতে হাসি চেপে রেখে একটা সিরিয়াস ভাব ধরি। পাশ থেকে মারুফ হঠাৎ করেই খানিকটা সিরিয়াস গলায় বলে উঠে, “রাতুল তুই না এইবার চার সাবজেক্টে ফেল করছোস?”রাতুল মাথা নাড়ে, “তিন সাবজেক্টে।” “ঐ হইলো।” বলে মারুফ। পাশ থেকে সায়েম বলে উঠে, “শুন রাতুল তোর জন্য একটা ভালো খবর আছে।““কি খবর”রাতুল তাকায় সায়েমের দিকে। সায়েম দাঁতগুলো মেলে বলে,“তোকে আর ফেল করার লাগবেনা রাতুল। এই দেখ তোর জন্য আমরা খন্দকার স্যারের কাছ থেকে প্রি টেস্টের সবগুলা সাবজেক্টের প্রশ্নপত্র নিয়ে আনছি। একেবারে রিয়েল কোয়েশ্চেন। এইগুলা পড়লে সব কমন। নে তোর শেয়ারইট অন কর।”রাতুল বোকার মত তাকিয়ে থাকে। সায়েম ধমকে উঠে, “কি হইল শেয়ারইট অন কর। নাকি খারাপ ছেলেদের কাছ থেকে আম্মু কোয়েশ্চেন নিতেও নিষেধ করছে?”সায়েমের কথা শুনে আমরা আরেক দফা হেসে ফেলি। মারুফ অনেকটা জোর করেই রাতুলের পকেটে হাত ঢুকিয়ে ফোনটা বের করে। “হালা বলদায় দেখি ফোনের মধ্যে প্যাটার্নও দিয়া রাখে। নে নে প্যাটার্ন খুল।“ বলেই রাতুলের মাথায় হাত দিয়ে চটকানা দেয় মারুফ। তাড়া খেয়ে রাতুল তার শেয়ারইট অন করে। ফাইলটা রিসিভ করতে গিয়ে অবাক হয়ে বলে, “তোরা না কোয়েশ্চেন দিবি বললি। কিন্তু এইটা তো ভিডিও।“আমি আরও একটা চটকানা বসিয়ে দেই রাতুলের মাথায়। শালা ভিডিও ফরম্যাটেই তো কোয়েশ্চেনগুলা আছে। যা এখন সোজা বাসায় যা। রাতে পড়তে বসার সময় ওপেন করবি। এইবার দেখবি তোর পাশ ঠেকায় কে।“ বলেই আমরা তিনজন হো হো করে হাঁসতে লাগলাম। আমাদের হাসির কারণ রাতুল খুঁজে পায়না।
পরদিন ঘুম থেকে উঠলাম অনেক বেলা করে। ব্রেকফাস্ট করে বাইরে বের হতে প্রায় দুপুর হয়ে গেলো। অবশ্য এই ছুটির দিনে বাইরে যাবার তেমন একটা ইচ্ছা ছিলোনা। মারুফের ফোন পেয়ে যেতে হচ্ছে। খন্দকার স্যারের এসাইনমেন্টগুলা জমা দিতে হবে। কালকেই নাকি লাস্ট ডেট।কম্পিউটারের দোকানের সামনে যেতেই পেয়ে গেলাম মারুফকে। আমার আগেই চলে এসেছে সে। আমাকে দেখে বলে উঠল,“ বুঝলি দোস্ত কালকে রাতে কি যে একটা যন্ত্রণায় পড়ছি আর কইসনা।”“ক্যা কি হইছে?” জিজ্ঞেস করলাম আমি।“আরে বাল ঐ রাতুল পোলাটা আছে না, ঐ খানকির পোলায় কই থেকে যে আমার নাম্বার যোগার করছে আল্লায় জানে, কালকে রাতে আমারে একটানা দুইশ পঁয়ত্রিশটা ম্যাসেজ দিছে। খালি কয় আমার নাকি ফাঁসি হবে। এরকম পাগল আমার জীবনেও দেখিনাই।“আমি হাসলাম, “হো ঐ পোলায় আমারেও কালকে রাতে সাড়ে তিনশোটা ম্যাসেজ দিছে। ফোনের ম্যামরি একেবারে ফুল করে ফালাইছে হালায়।“আমরা বদরুল ভাইর ফটোকপির দোকানে ঢুকলাম। লোকটা নতুন এয়ারকন্ডিশন লাগিয়েছে দোকানে। ঢুকলেই গা জুড়িয়ে যায়। সায়েমদের পলিটিক্যাল পার্টির বেশিরভাগ মিটিং ইদানিং এখানেই হয়। আমাকেও মাঝে মধ্যে ওসব মিটিংয়ে থাকতে হয়। বলা তো যায় না কোন সময় কোন বিপদ আপদ আসে, তখন তো বড় ভাইয়েরাই রক্ষা করবেন। দোকানের একপাশে পড়ে থাকা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে আমি বসে পড়লাম।“বদরুল ভাই এসাইনমেন্টের কভার পেজ দেন তো ছয়টা। খন্দকার স্যারেরটা দিয়েন।“বদরুল ভাই ব্যস্ত। তার দোকানের কাজের ছেলেটা নিয়ে এলো পেজগুলো। আমার হাতে দিয়ে বলল,“ভাই আপনাগো ব্যাচের একটা পোলা আছে না? ঐ যে কারও লগে যে অত একটা মিশে না কেমন জানি বোকা সোকা।”“রাতুলের কথা বলতেছ? কেন কি হইছে?” জিজ্ঞেস করি আমি।“ঐ পোলাটার কাহিনী কি কন তো। একটু আগে আইসা এই লিখাটা একটা ‘এ ফোর’ কাগজে প্রিন্ট করে নিয়া গেলো। এই দেখেন ।” বলেই সে দোকানের ল্যাপটপটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিলো। স্ক্রিনে দেখতে পেলাম রঙ্গিন কালিতে লিখা, “সাদিয়ার সাথে প্রতারণার বিচার চাই। সায়েমের ফাঁসি চাই।”লিখাটা দেখেই মারুফ দেখলাম প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের বেগে দোকান থেকে বের হয়ে গেলো। আমিও তার পিছু নিলাম। মারুফের মোটরসাইকেলে চেপে আমরা পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম আমাদের কলেজে। শুক্রবার বলেই হয়ত আজ পুরো কলেজটা একেবারে জনশূন্য। মারুফকেও সেখানে কোথাও খুঁজে পেলাম না। আমরা সময় নষ্ট না করে আবারও মোটরসাইকেলে চেপে বসলাম। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাদিয়াদের বাসার সামনে পৌঁছে গেলাম। সেখানেই দেখতে পেলাম দৃশ্যটা। সাদিয়াদের বাসার সামনে রাস্তার উল্টো দিকে একটা এ ফোর কাগজ হাতে দাঁড়িয়ে আছে রাতুল। তার সামনে প্রায় হাত জোর করে মিনতি করে কি যেন বলছেন সাদিয়ার বাবা। আমরা আরও কাছে এগিয়ে গেলাম। সাদিয়ার বাবার কণ্ঠ শুনতে পেলাম, “দেখো বাবা, তোমাকে আল্লার দোহাই লাগে আমার মেয়েটার এমন সর্বনাশ কইরোনা।”রাতুল অবাক হয়ে বলে, “সর্বনাশ কই করতেছি আঙ্কেল। সাদিয়ার সাথে ঐ ছেলেগুলা অপরাধ করেছে। আমি তাদের বিচার চাচ্ছি।”“আমার বিচার দরকার নাই বাবা। তোমাকে আমি হাত জোর করতেছি তুমি দয়া করে ঐ কাগজটা ছিঁড়ে ফেলো। লোকজন এইসব দেখলে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। এই মহল্লার মানুষ আমাকে সম্মান করে। আমার সম্মান তুমি ধুলায় মিশাইওনা বাবা।”বেশ কিছু লোকজন ইতোমধ্যেই জড় হয়ে গেছে। জুম্মার নামাজ শেষে বাড়ি ফেরা লোকজন কৌতূহলী হয়ে মজা দেখছে।“দোস্ত ঐ যে সায়েম আইসা পড়ছে।“ রাস্তার ওদিকে দেখিয়ে বলল মারুফ। সায়েমের সাথে দেখতে পেলাম আরও কিছু লোকজন এগিয়ে আসছে। কলেজের সাবেক ছাত্রনেতা কালাম ভাইও তাদের মধ্যে একজন।কালাম ভাই হন হন করে এগিয়ে এসে বলল, “কি হইছে রে এখানে? দেখি দেখি কি হইছে?”সায়েম দেখিয়ে দিলো, “এই যে ভাই এই ছেলেটা।”“কোন ছেলেটা দেখি।” বলেই ভিড় ঠেলে রাতুলের সামনে এগিয়ে গেলো কালাম ভাই। “এই ছেলেটা?” আঙ্গুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলো কালাম ভাই।সায়েম জবাব দিলো, “হু ভাই।”রাতুলের দিকে তাকাল কালাম ভাই, “এই ছেলে তোমার সমস্যা কি? এখানে ঝামেলা শুরু করছ কেন? কি লিখেছ ওটা দেখি দেখি।” বলেই রাতুলের হাত থেকে কাগজটা কেড়ে নিল কালাম ভাই। লিখাগুলো উচ্চারণ করে পড়ল। তারপর সাদিয়ার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, “আঙ্কেল চলেন আমরা আপনার বাসার ভিতরে গিয়ে কথা বলি। এইখানে লোকজন ভিড় করতেছে। আপনি সম্মানি মানুষ। আপনার সম্মান রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। চলেন আঙ্কেল ভিতরে চলেন। এই সায়েম তুমি ঐ ছেলেটাকে নিয়ে ভিতরে এসো। আর বাইরের কোন লোককে আসতে দিওনা।”সায়েমের সাথে আমরাও ভিতরে ঢুকলাম। সাদিয়াদের ড্রয়িং রুমে ঢুকে সোফার পিছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লাম।
“তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ সাদিয়ার সাথে সায়েমের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। এবং সেই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে সাদিয়ার নগ্ন ছবি সায়েম তার বন্ধু বান্ধবকে দেখিয়ে বেরিয়েছে? রাইট?”মাথা ঝাকায় রাতুল, “হুম”।“কিন্তু আমি যতদূর জানি সায়েমের সাথে এই মেয়েটার কোন সম্পর্কই ছিলোনা। তার নগ্ন ছবি নেওয়া তো বহুদুর। কি সায়েম এই মেয়েটার সাথে কোন সম্পর্ক ছিল তোমার?”সায়েম মাথা নাড়ে, “না ভাই।”রাতুলের দিকে তাকায় কালাম ভাই, “এইবার কি বলবা তুমি?”রাতুল সঙ্গে সঙ্গে বলে, “আপনি সাদিয়াকে ডাকেন। বিশ্বাস না হইলে ওর কাছ থেকেই শুনেন সব কিছু।”সাদিয়াকে ডাকা হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ড্রয়িং রুমে এসে উপস্থিত হল। আমি তার দিকে তাকালাম। আগাগোড়া পুরোটাই চোখ বুলিয়ে নিলাম। উফফ, আজকে রাতে আবারও ঐ ভিডিওটা দেখতে হবে।“এই যে আপু আমাকে সত্যি করে বল তো তোমার সাথে কি এই ছেলের কোন সম্পর্ক ছিল?” জিজ্ঞেস করে কালাম ভাই।সাদিয়া ঢক গিলে । চারদিকে তাকায় একবার। তারপর মাথা নাড়ে, “না।”“এদেরকে তুমি কোন ছবি দিয়েছ?”“না।”রাতুল সঙ্গে সঙ্গে পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে। ভিডিওটা প্লে করে বলে “এই যে দেখেন এটা কি? দেখেন এইটা।”কালাম ভাই খপ করে মোবাইলটা কেড়ে নেয়, “তাহলে সাদিয়া কি মিথ্যা কথা বলতেছে?”রাতুল জবাব দেয়, “সাদিয়া ভয় পাচ্ছে আপনাদেরকে এই জন্য ও এরকম বলতেছে। তাছাড়া আংকেলের রিস্পেক্ট চলে যাবার ভয়েও ও স্বীকার করতেছেনা।”রাতুলের গালে কষে একটা চর বসিয়ে দেয় কালাম ভাই। “ভণ্ডামি করার জায়গা পাওনা তুমি তাই না? আমাকে ভিডিও শিখাইতে আসছ তুমি? এই ভিডিও তুমি কথা থেকে ইডিট করছ? হ্যাঁ? কথা থেকে ইডিট করছ তুমি? মোটিভ কি তোমার? আঙ্কেলের মত এরকম রিস্পেকটেবল পার্সনের ক্ষতি করতে আসছ কি উদ্দেশ্যে? সত্যি করে বল নাইলে কিন্তু আমি তোমাকে হাজতে ঢুকাব।”রাতুল কোন জবাব দেয়না। তার চোখের নিচে আমি পানি দেখতে পাই। কালাম ভাই ধমকে উঠেন, “ঐসব মায়া কান্না করতে আইসোনা এখন। দেখো রাতুল তুমি আমাদের এলাকার ছোট ভাই। তোমাকে এইজন্য যথেষ্ট স্নেহ করি আমরা। কিন্তু আমাদের স্নেহের মর্যাদা তুমি রাখলে না। আমার এখন ইচ্ছা করতেছে তোমাকে এক্ষুনি ধরে হাজতে ঢুকায় দেই। কিন্তু শুধু এই মেয়েটার রিস্পেক্টের কথা ভেবে তোমাকে আমি ছেড়ে দিচ্ছি। নেক্সট টাইম যদি আর কখনো তোমার নামে এরকম রিপোর্ট শুনি আমি কিন্তু আর একটা কথাও শুনবোনা বলে দিলাম। মনে থাকবে?”রাতুল জবাব দেয়না। শুধু মাথা নাড়ে। কালাম ভাই আঙ্কেলের দিকে ফিরে বলেন, “আমার মনে হয় আঙ্কেল এই ছেলে আর কোন ঝামেলা করবেনা। আর ঝামেলা করলে তো আমরা আছিই, ধরে ঠ্যাং ভেঙে দিব। আপনি আর কোন টেনশন নিয়েন না আঙ্কেল।”বিচার শেষ হয়। আমরা বেরিয়ে পড়ি। বাইরে এসে রাতুলকে আরও কিছুক্ষণ বোঝায় কালাম ভাই। “দেখো রাতুল এটা হচ্ছে তোমার পড়াশোনার বয়স। আর তিন দিন পরে তোমাদের টেস্ট পরীক্ষা। এইসময় যদি তুমি পড়াশোনা বাদ দিয়ে এইসব ফাতারামি করে বেড়াও তাইলে কি চলবে? যাও ভালো ছেলের মত বাসায় গিয়ে মন দিয়ে পড়াশোনা করো। এইসব আজেবাজে কাজ আর করিওনা।”আমরাও কালাম ভাইর সাথে সুর মেলাই, “বুঝছ রাতুল, কালাম ভাইর কথা মাথায় রাইখো।”
বিকেল বেলা বাদল ভাইর টঙ দোকানে চা খেতে গেলাম। মহল্লার ছেলে পেলেরা সেখানে আড্ডা দিচ্ছে । কেউ কেউ আবার মহা উল্লাসে ক্যারাম খেলছে। আমিও একটা ফাঁকা বেঞ্চে গিয়ে বসতেই শুনতে পেলাম, ওদের মধ্য থেকে কে যেন বলে উঠল, “বুঝছস আরিফ ঐ পাড়ার সিদ্দিক কাকার মাইয়াটা আছে না সাদিয়া না কি জানি নাম। ঐ মাইয়ার ঘটনা শুনছোস?”“কি ঘটনা?” দোকানের সবার দৃষ্টি ফিরে গেলো বক্তার দিকে। “আরে ঐ মাইয়া নাকি সবাইরে খালি ল্যাংটা ছবি পাঠায় বেড়াইতেছে। এক পোলায় নাকি তার ল্যাংটা ছবি পায়নাই এইজন্যে হে গিয়া মাইয়ার বাড়ির সামনে আন্দোলন করছে।”“কস কি? সত্যি নাকি?”“হো সত্যি। আইজ দুপুরে আমাগো কালাম ভাই শেষ পর্যন্ত গিয়া সালিশ বহাইছিল। সালিশে মীমাংসা হইছে।”“কি দিন আইলো রে। যুব সমাজটারে ধ্বংস করে দিতাছে এইসব নষ্ট মাইয়া গুলান। এইগুলা সব হইতাছে গিয়া কিয়ামতের লক্ষণ। এইসব মাইয়া মানুষের বাপ মা রে ধইরা মাইর দেওন দরকার। ঠিক কিনা?“হো ঠিক।”“তা কি ছবি দিছে দেখি? তোর কাছে আছে নি? থাকলে শেয়ারইটে দে তো।”“আমার কাছে নাই। খুঁজতাছি আমি। পাইলে তোরেও দিমুনে।”“মনে করে দিস কিন্তু। এইসব বেপর্দা মাইয়া মানুষরে ধইরা পুটকি মারে দেওন দরকার তাইলে আর যুব সমাজ ধ্বংসের ভয় নাই।”“ঠিক কইছোস।”আমার চা খাওয়া শেষ। আমি বিল দিয়ে উঠে পড়লাম। এসাইনমেন্ট গুলো এখনও রেডি করা হয়নি। কালকের মধ্যে জমা দিতে হবে। অবশ্য না জমা দিলেও সমস্যা নাই। সায়েম আছে। স্যারকে বলে সে ই সিস্টেম করে দিবে।
পরের কয়েকদিন রাতুলকে আর দেখতে পেলাম না। সায়েমের সাথেও অবশ্য এই কয়দিন আর তেমন একটা যোগাযোগ হলনা। সে তার মিটিং মিছিল নিয়ে মহা ব্যাস্ত। অবশ্য আমি নিজেও ডুব দিয়েছি পড়াশোনায়। আর কদিন পরেই প্রি টেস্ট শুরু। সায়েমের কাছ থেকে নেওয়া কোয়েশ্চেনগুলো দিবা রাত্রি মুখস্ত করে চলেছি। পরীক্ষার হলে আবার তাকেই আমার খাতা দেখাতে হবে কিনা।
পরীক্ষার দিন সকাল সকাল বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম। প্রথম দিন বলেই হয়ত একটু তাড়াতাড়ি যাওয়া। সিট খুঁজে পাবার একটা ব্যাপার আছে। অবশ্য শুধু সিট খোঁজার জন্যই না আরও একটা কারণে আমাকে তাড়াতাড়ি যেতে হচ্ছে। আমার সামনে বা পিছনে যেই ছেলের সিট পড়বে তাঁকে ভয় ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে সায়েমকে ওখানে এনে বসানোর দায়িত্বটাও আমাকে পালন করতে হয়।
পরীক্ষা শুরু হতে তখনও প্রায় এক ঘণ্টার মত বাকি। আমি টেবিলের উপরিপৃষ্টে কলম দিয়ে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র লিপি প্রস্তুত করছিলাম। এরকম সময় দেখি মারুফ এসে হাজির।“কিরে হালা, কতদুর?”আমি টেবিল থেকে মাথা না তুলেই বললাম, “এই তো দোস্ত আর তিন চারটা ইকুয়েশন বাকি। ওইগুলা লিখলেই হয়ে যাবে। সায়েম কই? আসছে?”“আরে ব্যাটা ঐটাই তো তোরে কইতে আইলাম। সায়েম আইছে, কিন্তু এইদিকে তো একটা কাহিনী ঘটে গেছে।”আমি টেবিল থেকে মাথা তুললাম, “কি হইছে?”“আয় এইদিকে।” বলেই আমার হাত ধরে টানতে লাগলো মারুফ। আমি তার পিছু পিছু গিয়ে চার তলার বারান্দায় হাজির হলাম।“ঐ দেখ।” মাঠের দিকে আঙ্গুল তুলে বলল মারুফ।আমি মাঠের দিকে তাকালাম। ফ্লাগ স্ট্যান্ডের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে রাতুল আর সাদিয়া। তাদের দুজনের হাতে দুটো ‘এ ফোর’ পেপার। সেখানে রং পেন্সিল দিয়ে কি যেন লিখা, এতদূর থেকে পড়া যাচ্ছেনা। একটা বড়সড় জটলার সৃষ্টি হয়েছে তাদের ঘিরে। অনেকেই মোবাইলের ফ্লাশ জ্বালিয়ে তাদের ছবি তুলছে। কেউ কেউ আবার ভিডিও করছে।আমি আর মারুফ প্রায় পাগলের মত নামতে লাগলাম সিঁড়ি বেয়ে। সায়েম হারামজাদায় কই আছে কে জানে। ফোনটা পর্যন্ত বন্ধ রাখছে। আমরা নিচে নামতেই পেয়ে গেলাম সায়েমকে। কালাম ভাইর সাথে হনহন করে ফ্লাগ স্ট্যান্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । আমরাও পিছু নিলাম তার।ভিড় ঠেলে ফ্লাগ স্ট্যান্ডের সামনে যেতেই কালাম ভাই প্রায় হুংকার ছেড়ে বললেন, “এই মেয়ে তোমার সমস্যা কি? সেইদিন না তুমি স্বীকার করলা সায়েমের সাথে তোমার কোন সম্পর্ক নাই। তাহলে আজকে আবার ঝামেলা বাঁধাইতে আসছ কেন?”সাদিয়া কোন জবাব দিচ্ছেনা দেখে আবারও ধমকে উঠলেন কালাম ভাই, “কি হইলো চুপ করে আছো কেন উত্তর দাও। মগের মুল্লুক পাইছ নাকি যা খুশি তাই করবা?”সাদিয়া এবারও জবাব দিলনা। তবে রাতুল মুখ খুলল। সে কালাম ভাইর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, “দেখেন ভাইয়া সেইদিন সাদিয়া ভয় পেয়ে ওরকম বলেছিল। সায়েমের সাথে ওর অনেক দিনের রিলেশন । এই জন্য সায়েমকে ও বিশ্বাস করে ঐ ছবিগুলো দিয়েছিল। কিন্তু বিনিময়ে সায়েম ওর সাথে প্রতারণা করেছে। আমরা এই প্রতারণার বিচার চাই।”“বিচার চাস শুয়ারের বাচ্চা?” চেঁচিয়ে উঠল কালাম ভাই। “এই মাইয়াটার মাথা খাইছস তুই না? ব্রেইন ওয়াশ করছোস সাদিয়ার? কত টাকা দিছোস এই মাইয়ারে? এই মেয়ে কত টাকা নিছ তুমি? কত টাকার বিনিময়ে এই নাটক শুরু করছ?”“ভদ্র ভাবে কথা বলেন আপনি।“ কালাম ভাইর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল সাদিয়া। “আপনি তখন থেকে আজেবাজে কথা বলে যাচ্ছেন। আপনার কোন রাইট নাই এভাবে বলার। আমি আমার বিচার চাইতে আসছি। দয়া করে আমাকে বাঁধা দিবার কোন চেষ্টা করবেননা। নাহলে আমি আইনের আশ্রয় নিবো।”কালাম ভাই হুংকার ছাড়লেন, “তুমি আমাকে হুমকি দিচ্ছ? হুমকি দিচ্ছ আমাকে? তুমি চেনো আমাকে? এই মেয়ে তুমি চেনো আমাকে? তোমরা দুই জনই ভালো মত শুনে রাখো, আমি তোমাদেরকে আধা ঘণ্টার সময় দিচ্ছি। এই আধা ঘণ্টার মধ্যে যদি তোমরা ক্যাম্পাস ত্যাগ না করো আমি কিন্তু বলে দিলাম ভয়ংকর কিছু ঘটে যাবে। মনে রাইখো এইটা।” বলেই কালাম ভাই তার মোটরসাইকেলের দিকে এগোতে লাগলেন। আমরাও আর দাঁড়িয়ে ঠেকে সময় নষ্ট করলাম না। পরীক্ষার ঘণ্টা পড়ে গেছে। হুড়মুড় করে আমরা যে যার রুমের দিকে ছুটতে লাগলাম।
পরীক্ষার খাতায় কি সব হাবিজাবি লিখলাম কে জানে। প্রথম ঘণ্টা পড়তেই দেখি সায়েম খাতা জমা দিয়ে বের হয়ে গেলো। আমাকে আর মারুফকেও ইশারা করলো বের হয়ে আসতে। আমরা খাতা জমা দিয়ে পিছু নিলাম সায়েমের। নিচে নেমে দেখি এখনও পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে রাতুল আর সাদিয়া। কৌতূহলী জনতা ঘিরে রেখেছে তাদের। আমরা সেদিকে ভ্রূক্ষেপ না করে কলেজ থেকে বের হয়ে আসলাম। মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কালাম ভাইর বাসায়। ওখানে হালকা নাস্তা করলাম। তারপর আট দশজন ছেলেকে নিয়ে মুখে একটা কালো কাপড় বেঁধে মোটরসাইকেলে চেপে ছুটলাম রাতুলদের বাসার দিকে।রাতুলদের গেটের সামনে আসতেই আমাদের মোটরসাইকেলগুলো থেমে গেলো। আমরা হাতে একটা করে ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প নিয়ে সবাই মিলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়লাম বাসার ভিতরে। যে যা সামনে পেলাম ভাঙতে শুরু করলাম। আমি সোজা ঢুকে পড়লাম রাতুলের বেডরুমের ভিতরে। আমার আক্রোশটা তার উপরেই ছিল বেশি। রুমে ঢুকে দেখি নানান রকম যন্ত্রপাতি এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দেওয়ালের একপাশে রঙ্গিন কাগজটা চোখে পড়ল। সেখানে দেখি বড় করে লিখা, প্রোজেক্ট টাইম মেশিন। ও জিনিস দেখে আমার এই রাগের মধ্যেও হাসি পেলো। আমি প্রথমে যন্ত্রপাতিগুলো স্ট্যাম্প দিয়ে ভাঙলাম। তারপর কাগজটায় এবং হ্যাঙ্গারে ঝুলানো কাপড়গুলোয় আগুন ধরিয়ে দিলাম। রাতুলের টেবিলের উপরে একটা ডায়েরি চোখে পড়ল। ওটার পাতা উল্টাতেই দেখি সারা ডায়েরি জুড়ে লিখা, সাদিয়া…সাদিয়া…সাদিয়া……। রাগে আমার গা জ্বলে উঠল। ডায়েরিটা পুড়িয়ে একেবারে কয়লা বানিয়ে দিলাম। রুমের মধ্যে আরও যা কিছু পেলাম সব ভেঙে তছনছ করে ওখান থেকে বের হয়ে গেলাম। ততক্ষণে বাড়ির সদস্যদের হাত পা শক্ত করে বেঁধে ফেলা হয়েছে। কালাম ভাইর নির্দেশ মত আমি মোবাইলটা বের করে তাদের সবার ছবি তুললাম। তারপর একটা ফেইক আইডি দিয়ে সেই ছবিগুলো রাতুল এবং সাদিয়ার ম্যাসেঞ্জারে পাঠিয়ে দিলাম। সাথে একটা ছোট ম্যাসেজ লিখে দিলাম, “কথা না শুনলে পরিণতি এর থেকেও ভয়ংকর হবে।”আমি জানি এটুকুতেই কাজ হয়ে যাবে। অন্তত আমার অতীতের সমস্ত অভিজ্ঞতা সেটাই বলছে। আমি নিশ্চিত ছবিগুলা দেখা মাত্র রাতুল তার মত বদলাবে। আন্দোলন ছেড়ে সে সঙ্গে সঙ্গে বলে বসবে, এগুলো সব ছিলো তার চালবাজি। সায়েমকে ফাঁসানোর জন্য প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতার উস্কানিতে সাদিয়াকে সে টাকা খাইয়ে এখানে নিয়ে এসেছে। আরও একটা ম্যাসেজ দিয়ে রাতুলকে আমি এমনটাই বলার নির্দেশ দিলাম।
রাতুলদের বাসা থেকে বের হয়ে আমরা আবারও দলবল নিয়ে রওনা দিলাম কলেজের উদ্দেশ্যে। আমাদের বুনো উল্লাস আর মোটরসাইকেলের বিকট আওয়াজে রাস্তার দুপাশের লোকজন ভয় পেয়ে সরে যেতে লাগলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমরা কলেজের কাছাকাছি চলে এলাম। গেটের সামনে আসতেই দেখি সায়েম দাঁড়িয়ে আছে। কলেজের ভিতরে তখন মানুষের ঢল নেমেছে। কয়েকটা টিভি চ্যানেলের সাংবাদিককেও দেখা যাচ্ছে। আমি বাইক থেকে নেমে দাঁতগুলো বের করে বললাম, “দোস্ত হালুয়া একেবারে টাইট দিয়া দিছি ব্যাটার। এইবার দেখ কেমনে বাপ বাপ করে মাফ চায়। পিরিতি এইবার পুটকি দিয়া বাইর হয়ে যাবে পোলার।”আমার দিকে এগিয়ে আসে সায়েম। আচমকা সে আমার শার্টের কলার খপ করে ধরে বসে। “আরে আরে করিস কি?” চেঁচিয়ে বললাম আমি। সায়েম কোন জবাব দেয়না। সোজা আমার নাক বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়।“আরে হারামজাদা তোর সমস্যা কি? এরকম করোস কেন?” ঘুষি খেয়ে বললাম আমি।সায়েম আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোরা আমার সর্বনাশ করে দিলি রে।”“ক্যা কি হইছে?” জিজ্ঞেস করি আমি। সায়েম তার স্মার্টফোনটা আমার দিকে এগিয়ে দেয়। আমি হাতে নেই ওটা । একটা টিভি চ্যানেলের খবর লাইভ দেখাচ্ছে। স্ক্রিনে কালাম ভাইকে দেখতে পেলাম। তাঁকে ঘিরে রেখেছে সাংবাদিকরা। এক মহিলা সাংবাদিক দেখি মাইক্রোফোন হাতে জিজ্ঞেস করছে, “আমরা ভিক্টিমের মুখ থেকে যতদূর শুনেছি অপরাধী আপনার রাজনৈতিক সংগঠনের একজন স্বয়ংক্রিয় কর্মী। এ বিষয়ে আপনি কি বলবেন?” কালাম ভাই মাথা দুলিয়ে বলছে, “এই ব্যাপারটা আমরাও অবগত হয়েছি। অ্যাবসুলেটলি এটা আমাদের জন্য একটা লজ্জাজনক ঘটনা। কিন্তু আপনারা সবাই জানেন আমাদের রাজনৈতিক সংগঠন সর্বদা মহান আদর্শে বিশ্বাসী। আমরা কখনই আমাদের সংগঠনে কোন অপরাধিকে ঠাই দেইনা। একারণে আমরা লিখিত ভাবে আমাদের সংগঠন থেকে অপরাধিকে বহিষ্কার করছি। এবং একই সাথে প্রশাসনের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি অপরাধীকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যাবস্থা করার জন্য।”আমি মোবাইলটা ফিরিয়ে দিলাম। “কি করবি এখন? কালাম ভাইর সাথে যোগাযোগ হইছে?”“হো।”“কি কয়?”“হারামজাদায় এখন আর আমারে চিনেনা। তহন দেখা করতে গেছিলাম। আমারে দেইখাই শুদ্ধ ভাষায় কয়, অপরাধ যেহেতু করেছ তাই শাস্তি তোমাদের পেতেই হবে। আমি তো আর আইনের বাইরে গিয়ে তোমাদের বাঁচাতে পারিনা।” “তাইলে? এখন কি করবি?” জিজ্ঞেস করি আমি।সায়েম উদাস গলায় বলে, “জানিনা।”
দশ বছর পর।
“এই যে শুনছেন? উঠেন। বাজারে যেতে হবে। এত বেলা করে ঘুমালে আর ভাত খেতে হবেনা।” রাতুলকে ধাক্কা দেয় সাদিয়া।“আজ ছুটির দিন তো। একটু ঘুমাতে দাও না। কাল অনেক রাত পর্যন্ত টাইম মেশিন বানানোর কাজ করেছি। এখন একটু ঘুমাতে দাও তো।” বলেই উল্টো দিকে ঘুরে চোখ বুজে রাতুল।“হয়েছে, বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে গেছে এখনও তার বাচ্চামি যায়না। এবার না উঠলে আমি কিন্তু সত্যি সত্যি গায়ে পানি ছিটিয়ে দিব। এই দেখো আমি পানি আনতে গেলাম।” বলেই সাদিয়া রুম থেকে বেরুনোর জন্য পা বাড়ায়। পেছন থেকে তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলে রাতুল। চমকে উঠে ঘুরে তাকায় সে। হয়ত খানিকটা লজ্জাও পায়। হাত ধরে একটা হ্যাচকা টান মারে রাতুল। নিজের ব্যালেন্স রাখতে পারেনা সাদিয়া। হয়ত পড়ে যায় সে। সে খবর আমাদের জানা হয়ে উঠেনা।
অনীক রশিদ (Aneek Rashid)
Send private message to author



