টাকা কামাই, টাকা জমাই

আজকাল চারিদিকে যা সব হচ্ছে দেখে প্রায়শই ভয় লাগে। জীবনের বাস্তবতাগুলো বড্ড বেশি তেতো লাগে। বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে আজকাল বিভিন্ন লেখা উঠে আসে। আমি মাঝে মধ্যে ছেলেমেয়েগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। আমার বড্ড অস্থির লাগে। এদের জন্য সেই কবে থেকে করে যাচ্ছি! নিজের সাদ আহ্লাদ সব বিসর্জন দিয়ে করে যাচ্ছি। মাঝে মধ্যে একান্তে একটা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খায় – আচ্ছা! এরাও কি কখনো আমার সাথে এমন করতে পারে? আমার বিশ্বাস হয় না। তবুও! কেন যেন চিন্তাটা ঠিকই মাথায় ঘুণপোকা হয়ে কুড়তে থাকে।

আমি মাঝে মাঝে এই চরম বাস্তবতা দেখতে চলে যাই একটি বৃদ্ধাশ্রমে। কি জানি কেন? আমি কি নিজেই নিজেকে ওখানে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছি মনে মনে? কে জানে, ভবিষ্যৎ কি খেলা দেখাবে? তবে ওখানে গেলে কেন জানি মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়, এক একজনের জীবনের করুণ করুণ সব কাহিনীগুলোগুলো শুনলে মাঝে মাঝে মনে হয় কার জন্য করছি? কেন করছি?

একদিন ওখানে গিয়ে দেখি সকালের রোদে ফ্লাওয়ার বেডে নিড়ানি দিচ্ছেন এক থুত্থুড়ে বৃদ্ধ।
কাছে গিয়ে কি করছেন গো চাচা মিয়া জিজ্ঞাস করতেই ফিক করে হেসে দিলেন মাড়ি বের করে। মাড়িতে একটি দাঁতেরও দেখা নেই, অথচ কি সুন্দর মনকাড়া হাসি!
হেসেই জবাব দিলেন কাজ করি।
আমি আবার জিজ্ঞাসা করি, এই বুড়ো বয়সে আপনাকে কে কাজ করতে বলেছে? ঐ যে বাকি সবাই মিলে গল্প করছে! আর তা ছাড়া বাগানে তো মালী কাজ করছেই।
উনি আবার মাথা দুলিয়ে হেসে হেসে বললেন, কাজ করলে টাকা পাব।
আমি একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম, এখানে আপনি টাকা দিয়ে কি করবেন?
বললেন, টাকা জমাই; বলেই আবার নিড়ানি দিয়ে ফ্লাওয়ার বেডের আগাছা তুলতে লাগলেন।

ওখানকার ম্যানেজমেন্টের একজনার সাথে ইতিমধ্যে আমার খুব সখ্যতা হয়ে গেছে। ওর কাছেই জানতে পারলাম এই বৃদ্ধের করুণ কাহিনী। ওটা বলব তবে এনার মুখ থেকে নয়, বৃদ্ধের মুখ থেকেই। এই বৃদ্ধের মনে বদ্ধমূল ধারণা সন্তানদের জন্য টাকা সঞ্চয় করতে হবে। ওনার মানসিক অবস্থার কথা জেনেই বৃদ্ধাশ্রমের ম্যানেজমেন্ট উনি কোন কাজ করতে চাইলে বাধা দেন না, বরং ঐ যে ওনার টাকার একটা আর্জ রয়ে গেছে! তাই কোন একটা কাজ করলেই বিনিময়ে ওনার হাতে কিছু টাকা তুলে দেন। ওনারা জানেন এ টাকা ওনার কোন কাজে আসবে না তবুও ওটুকুই ওনার মানসিক শান্তি।

একবার দুবার তিনবারের বার ওখানে গিয়ে বুড়োর সাথে আমার সখ্যতা গড়ে ওঠে। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাকে বলেন একটা চিঠি লিখে দিতে পারবে বাবা? আমার ছেলেদের পাঠাবো।
আমি বললাম, কেন নয় চাচা? অবশ্যই লিখে দেব।
উনি বললেন, আমিই লিখতাম! তবে আজকাল আর কলম ধরতে পারি না, কেমন যেন হাত কাঁপে।
আমি বললাম, কোন সমস্যা নেই চাচা, আমি লিখে দেব, কি লিখতে হবে শুধু আমাকে বলে দিন।

চিঠিটা কিভাবে লিখতে হবে আমি জানি না। তুমি সাজিয়ে গুছিয়ে কথাগুলো লিখে দিও।

উনি বলছেন, আমি লিখছি –

প্রিয় সন্তানেরা,
কিভাবে কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছি না।

না হয় সেই কলেজ জীবন থেকেই শুরু
ছাত্র পড়াই, টাকা জমাই;

কোন একটা সময় ছাত্র পড়িয়ে টাকা উপার্জন, সেটা প্রয়োজন
বাবা মায়ের কাছে হাত পাততাম না,
কেন পাততাম না! সেটা খুব দুঃখের কথা, ওটা আমার মধ্যেই না হয় থাক!
টাকা উপার্জন থেকে টাকা জমানো – এটা ওটা সেটার প্রয়োজন মেটানোর জন্য
সেই থেকে শুরু, তারপর থেকে অভ্যেস;
তারপর সময়ের গাড়িতে বয়সের চাকা
বিয়ে, পরিবার তারপর সন্তান (একে একে তোমরা)
চাকরি বাকরি – উদ্দেশ্য একটু ভালোভাবে টাকা উপার্জন
সময়ের গাড়িতে চাহিদার গতি
টাকা টাকা টাকা, চারিদিকে চাহিদা
বাড়িভাড়া, খাওয়া দাওয়ার খরচ, তোমাদের পড়ালেখা
তোমাদেরর বায়না, এটা ওটা সেটা
ক্রমবর্ধমান চাহিদার পাহাড়
প্রয়োজন আরও টাকা, আরও, আরও, আরও
একটি শেষ না হতেই দরজায় আরেকটি চাহিদা এসে দাঁড়ায়
চাহিদার একটি দরজা বন্ধ করতে না করতেই
হঠাৎ দমকা এক চাহিদার বাতাসে অন্যদিকের জানালা খুলে যায়
আমি চাহিদার মুখগুলো বন্ধ করতে চাচ্ছি
টাকার যোগান দিতে ওভারটাইম, নাইট ডিউটি
পরিবারকে বুঝতে দেই নি, বুঝতে দেই নি তোমাদের;
তোমরা অবশ্য বুঝতেও চাও নি কখনো,
আজকালকার সন্তানরা অবশ্য বুঝতেও চায় না
তোমাদের কেবলই চাহিদা, ক্রমবর্ধমান চাহিদা;
ধ্যাত! কি বকছি এসব?
বাবার কাছে চাইবে না তো চাইবে কার কাছে?
আমার না হয় কিছু বেশি ঘণ্টা কাজ করতে হচ্ছে
ব্যাপার না, তোমাদের চাহিদা তো মিটছে!

তোমরা বড় হলে, তোমাদেরও বিয়েশাদী হলো
তোমরাও উপার্জন শুরু করলে
বাবার কষ্টটা কি তখন কিছু বুঝেছিলে?
কি জানি! হয়তো! হয়তো না,
আজকালকার ছেলেমেয়েরা এগুলো বুঝেও বোঝে না;
তারপর সময়ের চাকায় একটা সময় আলাদা হয়ে গেলে
মাঝে মধ্যে বুড়োবুড়িকে দেখতে আসতে
সে সময় আমার আর শরীরে আর কুলোচ্ছিলো না
তাই চাকরি থেকে রিটায়ার নিয়েছিলাম
বেসরকারি চাকরিতে কি আর রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট থাকে?
যতদিন শ্রম ততদিনই টাকা
তারপর হাত ফাঁকা;
ভেবেছিলাম, তাতে কি? তোমরা বড় হয়েছ না?
তোমরাই আমাদের সহায় তোমরাই সম্বল;

তোমরা মাঝে মধ্যে কিছু টাকা দিতে
মাঝে মধ্যে ফোনে খবর নিতে
আমাদের বুড়োবুড়ির আর খরচ কি?
পৈত্রিক সূত্রে ছোট্ট টিনের বাড়িটা তো ছিলোই!
ঢাকা শহরে মাথার ওপর ছাদ থাকলে আর লাগে কি?

সময়ের চাকা গড়াতে গড়াতে বুড়িটা একসময় চলে গেলো
স্বার্থপরের মতো আমায় একা ফেলে
তোমরা এসেছিলো সেদিন সকলে, অনেক কান্নাকাটি হলো
তারপর রাত গভীর হতে না হতে সবাই যার যার বাসায় চলে গেলে,
বুঝি আমি, আজকাল খালি বাড়ি রেখে বাইরে থাকা খুব একটা নাকি সেফ না
আমার একলার জীবন শুরু হলো;

সময় গড়ালো, সময় গড়ালো
সময়ে তো সময় গড়িয়ে যাচ্ছিলোই! একাকীত্বে সময় কি আর গড়ায়?
মাঝে মাঝে কেমন যেন সময় থমকে যায়!
সময় থমকে গেলে তোমাদের বাসায় ঘুরতে যেতাম
কেমন যেন বিরক্ত হতে,
আমি বুঝতে পারতাম, উটকো বুড়োটাকে তখন হয়তো তোমাদেরর বোঝা মনে হয়েছে!
তারপর টাকা দেওয়াও কমিয়ে দিয়েছ, সারাক্ষণই নাকি তোমাদের হাতটান লেগে থাকে
আমি বুঝি! টাকার মূল্য আমার থেকে আর কে ভালো বুঝেছে!

তোমরা একসময় বায়না ধরলো ব্যবসা করবে
ওতে নাকি অনেক টাকা, চাকরিতে আজকাল পুষছে না
মুখে বললেই কি ব্যবসা হয়? পুঁজি লাগে না? কোথায় পাবে তোমরা অত টাকা?
এবার তোমাদের শুরু হলো বাসায় ঘন ঘন আনাগোনা
বড় ছেলে তার বাসায় থাকতে বলে তো ছোট ছেলে তার বাসায়
বাবা তুমি একা মানুষ, একা থাকবে কি করে?
আমিও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচি, কদিন বড় সন্তানের বাড়ি কদিন ছোট সন্তানের
তারপর একদিন সব ছেলেমেয়ে একযোগে ধরলে, বাবা ব্যবসায় পুঁজি লাগবে
ঐ আদিকালের টিনের ঘরটা তো খালিই পড়ে থাকে
ওটা বিক্রি করলে আমাদের পুঁজি হয়ে যাবে,
তা ছাড়া তুমি তো এখন আমাদের কাছেই আছ! তোমার আর চিন্তা কি?

তোমদের কোন চাহিদাটা কবে না মিটিয়েছি?
আমার আর কয়দিন? তোমরা যদি সুখে থাক আমার আর বলার কি আছে?
ভিটে বিক্রি হলো, আমার দু-চারদিন একটু মন খারাপ ছিলো
তারপর তোমাদের হাসি মুখ দেখে আমারও মুখে হাসি ফোটে,
তোমরা টাকার ভাগাভাগি করে
ভাগাভাগি করলে আমার থাকার
কদিন বড় ছেলের বাসায় কদিন ছোট ছেলের
মেয়ের বাসায় কি আর থাকা যায়?
তারপর সময়ের চাকায় সময় গড়ায়
তোমাদের বাসায় স্থান সংকট প্রকট হতে থাকে
প্রকট হতে হতে তোমরা আমাকে দিয়ে গেছে এখানে
এটা নাকি সব বুড়োবুড়িদের থাকার জায়গা
তোমাদের বাসায় একা একা আমার আর দিন কাটাতে হবে না
আমি আমার মত সব বুড়োবুড়ির সাথে নাকি হাসি গল্পে মজায় দিন কাটাব এখানে,
বাহ! বেশ আরামেই একদম মজায় দিন কাটাচ্ছি
সন্তান সন্ততি, আত্মীয় স্বজন ছাড়া একাকীত্বের ভীষণ এক আরামের দিন কাটাচ্ছি;

কেন জানি আমার মনে হচ্ছে তোমরা আমার কাছে আবার আসবে,
যদি আবার কখনো টাকার প্রয়োজন হয়!
কিন্তু আমি দেব কোত্থেকে?
তাই আজকাল যে কাজ পাই তাই করি, একটু একটু করে টাকা উপার্জন করি
একটু একটু করে সঞ্চয় করি
যদি তোমরা এসে আবার টাকা চাও? একবারে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারব না আমি;

তাই আমি টাকা কামাই, টাকা জমাই;
তোমাদের জন্যই এখনো কামাই
তোমাদের জন্যই এখনো জমাই
তোমাদের যে কোন সময়ই তো লাগতে পারে!
কোনদিন যদি দেখতে এসে টাকা চাও!
তখন যাতে তোমাদের খালি হাতে ফিরে যেতে না হয়।


উনি মুখে মুখে চিঠিটা বলছিলেন আমি লিখছিলাম
চিঠিটা শেষ করে উনি চুপ করে বসে রইলেন।
আমি স্তব্ধ হয়ে ওনার হাত ধরে বসে রইলাম।

জীবন তার কত রঙই না দেখায়!

টাকা কামাই, টাকা জমাই

  • আহসানুল হক (Ahsanul Huq)

#চিঠি

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!