জানালায় কেউ!!!

জামিলের বাবা সরকারি চাকরি করেন। তাই মাঝে মাঝে ট্রান্সফার হন অন‍্য জায়গায়। আসলে পেশায় ডাক্তার। সরকারি হাসপাতালের। বদলি হয়ে এবার গেলেন এক পাহাড়ি অঞ্চলে। আসলে পাহাড় না। টিলা। চারদিকে কেমন যেন নিশ্চুপ। সুনশান জায়গা। নীরব দুঃখে যেন এই মফস্বল শহরের এই অঞ্চল টা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।
রাজবাড়ী। এটা হল জামিলদের নতুন থাকার বাড়ি আবার এলাকার নামও।
এই বাড়ি পাকিস্তান আমলের এক জমিদার তৈরি করেন। এলাকার নাম এই বাড়ির নামেই মুখে মুখে পাল্টে রাজবাড়ী হল।
দুতলা বাড়ি।
সরকার কয়েকবার মেরামত করে। রঙ ও করেছিল। কিন্তু এখন সেই রঙ আর নেই। উঠে গেছে।
ভুতুড়ের মত লাগে।
জামিল তেমন পছন্দ হলো না। তবে তার রাজবাড়ীতে থাকার শখ।
তাই পছন্দ এমনিই হবে।
ফটক দিয়ে ঢুকলেই বাড়িটা নজরে পরে। কারুকাজ গুলো বুঝা যায়না। তবে নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর। ইস আবার যদি রঙ করে দেয়া হত। মনে মনে ভাবল জামিল।
কেয়ারটেকার জামিলদের জিনিসপত্র নিয়ে ভেতরে গেলেন। সঙ্গে বাবা মা।
জামিল একটু দাড়িয়ে দেখতে লাগল বাইরে।
হঠাৎ একটা জানালায় একটা মেয়েকে দেখল। তার দিকে চেয়ে হাসল। তার বয়সী। মেয়েটা আঙুল মুখে দিয়ে বোঝালো কাউকেই যেন না বলে।
জামিল খুশি হলো। তার খেলার সাথী হল। কাউকেই বলল না। এই ভেবে যে মেয়েটা লুকিয়ে ঢুকেছে।
জামিল তাড়াতাড়ি করে ঘরে ঢুকে নিজের ব‍্যাগ বই খাতা পেন্সিল ড্রয়িং বুক। গুছাতে লাগল।
বলল, মা। আমি ছাদে যাব।
না। এখন না। আগে কিছু একটা খেয়ে নাও।
আমি ছাদে গিয়ে খাব…..
আচ্ছা বাবা। ওই ব‍্যাগে আপেল আছে। নিয়ে যাও

কিন্তু জামিল দুটো আপেল নিয়ে ছাদে না গিয়ে দুতলার একেবারে কোনার ঘরে গেল।
ঘরটা খোলা ছিল। সে ঘরে গিয়ে দেখল তার বয়সী ঐ মেয়েটা একটি কাগজের প্ল‍েন নিয়ে খেলছে।
জামিল বলল, তুমার নাম কি?
মেয়েটি হাসি মুখে বলল, টুম্পা।
আমার নাম জামিল।
আমি জানি…..
কি করে……?
সবাই তুমাকে ঐ নামেই ডাকতে শুনেছি।
আচ্ছা তুমি কোথায় থাক?
জানালা দিয়ে টুম্পা হাত দিয়ে দেখাল…..ঐ যে….ঐ নীল বাড়িটা।
কিন্তু তুমি এখানে কিভাবে এলে?
আমি রোজ এখানে খেলতে আসি।
ভয় করে না?
হা হা হা…..ভয় কেন করবে?
আচ্ছা এই নাও আপেল খাও….
টুম্পা আপেল নিল। কিন্তু খেল না বেশি একটা কামড় দিয়ে পাশে রেখে দিল।
তারপর তারা দুজন গল্প করতে লাগল। সন্ধ‍্যা হবার আগেই জামিল চলে যেতে চাইল। টুম্পা বলল আচ্ছা কালকে এসো আমি খেলনা নিয়ে এসো।
ঠিক আছে।কিন্তু তুমি কিভাবে যাবে। নিচে দিয়ে গেলে ত দেখে ফেলবে।
কে বলছে আমি ঐদিকে যাব? আমি ত এই প্লেন দিয়ে উড়ে চলে যাব। বলে হাসতে লাগল।
জামিলও বুঝল মজা করছে। তাই সে চলে এসে মাকে ব‍্যস্ত রাখল।যাতে টুম্পা লুকিয়ে সিড়ি দিয়ে চলে যায়। বাবা আর কেয়ারটেকার বাজারে।

পরদিন সকাল বেলা বাবা চলে যেতেই জামিল বাড়ি থেকে বের হলো। একটু ঘুরবে বলে। কিন্তু মা ডেকে নিয়ে ঘরে বসে ছবি আকতে বললেন। জামিল মন খারাপ করল। ড্রয়িং বুক নিয়ে ছাদে উঠার জন‍্য সিড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। দুতলায় এসে মনে হলো টুম্পার কথা। ভাবল হয়ত আজও লুকিয়ে আসতে পারে। গিয়ে দেখল নেই। একটা আপেলটা রয়েছে।কিন্তু সেটা কামড়ের দাগ নেই। কিন্তু টুম্পা ত খেয়েছিল। জামিল হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ ভাবল। পর আপেলটা রেখে ছাদে চলে গেল। গিয়ে দেখল এক কোনায় টুম্পা দাড়িয়ে আছে। হাতে তার কাগজের প্লেন। রাস্তার দিকে চেয়ে আছে।
জামিল ডাকল। কিন্তু টুম্পা তাকাল না। জামিল এগিয়ে যাবে তখনই টুম্পা দৌড়ে ছাদের ছোট্ট ঘরটায় চলে গেল। জামিল অবাক হলো। পরোক্ষণে ভাবল। লুকোচুরি খেলা। তাই সেও তার পিছনে ঘরটায় গেল।
কিন্তু ঢুকতেই প্রচন্ড দুর্গন্ধ যেন এসে ঝাপিয়ে পড়ল। সে নাক মুখ হাত দিয়ে ঢাকল। এটা স্টোর রুমের মত। পুরোনো ভাঙা জিনিস পত্র।
ঘরের টুম্পা কে দেখতে পেল না।
বলল, টুম্পা। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো। এখানে কি দুর্গন্ধ।
কিন্তু টুম্পা কোনো কথা বলল না। ঘরের কোনায় কি যেন নড়ে উঠল। জামিল ভাবল টুম্পা।
বলতে লাগল, টুম্পা তুমাকে দেখে ফেলেছি। বলেই ওখানে যেতেই একটা বস্তা দেখল। ঐখান থেকেই দুর্গন্ধ আসছে। সে এগিয়ে গেল। মুখ টা খুলতেই সে জোরে চিৎকার করে উঠল। একের পর এক চিৎকার করতে লাগল।
মা দৌড়ে এলেন। ছেলেকে খুজে পেলেন ছোট্ট ঘরটায়।

জামিল কাপছে। মা জড়িয়ে ধরে আছেন।
পুলিশ লাশটাকে বের করল। জামিল উকি দিয়ে প্রথম দেখল মুখটা। সে যেন পাথর হয়ে গেছে। কি বলবে। এতো টুম্পা।কিন্তু……… কিন্তু টুম্পা ত জীবিত ছিল।

পুলিশ বডি নিয়ে চলে গেল। বস্তার ভিতরে পাওয়া একটা আংটির সূত্র ধরে খুনি কে বের করে। ঐ বাড়ির কেয়ারটেকার আবুলকে। টুম্পার পরিবারের সাথে শত্রুতা বশত টুম্পা কে ঐ যে ঘরটায় জামিল টুম্পাকে দেখেছিল ঐখানেই খুন করে। মাথায় আঘাত আর বালিশ চাপা দিয়ে। তার হাতে ছিল সেই কাগজের প্লেনটা। এটা নিয়ে খেলতে এসেছিল বাড়ির ভিতর। কিন্তু বের হওয়া গেল না। কাগজের ছোট্ট প্লেনটায় ছড়ে তার প্রাণপাখি উড়াল দিয়েছিল।

একমাস পর…….
জামিলের মায়ের কথাতে বাসা পাল্টে অন‍্য জায়গায় চলে যাবে। জামিল ঘর থেকে বেরতেই উঠোনে নামার সিড়িতে ঐ আপেলটা পেল। সে কাপা হাতে তুলল।
উঠোনে নামল।
বাবা মা ব‍্যাগ গুলো গাড়িতে তুললেন। এখন হাত ধরে জামিলকে নিয়ে যাচ্ছেন। জামিল কি যেন মনে করে ঐ জানালায় থাকালো।
মা…..ঐ যে টুম্পা…..
কি হলো বাবা। এখানেত কেউ নেই। কেউ নেই বাবা। চলো গাড়িতে।
সবাই না দেখলেও জামিল দেখছে। টুম্পা তাকিয়ে আছে।।। হাত নাড়ছে…….
কাগজের প্লেনটা টুম্পা উড়িয়ে দিল। ঐ দূর আকাশে মিলিয়ে গেল………….

লেখক : সাইফুল ইসলাম রবিন (Saiful Islam Robin)

Send private message to author
What’s your Reaction?
4
2
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Saiful Islam Robin
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Nahidur Islam
Guest
Nahidur Islam
4 years ago

Nice

1

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!