বিয়ের আগে বর কনে দু’পক্ষই বিভিন্ন ভাবে পরস্পরের যোগ্যতা যাচাই করে থাকেন। এই প্রথা সব সময়েই ছিল। তবে সময়ের বিবর্তনে এর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। পাল্টে গেছে এখন অনেক কিছুই।
বাংলাদেশে বিয়েতে ঘটকের প্রথা বহু আগে থেকেই প্রচলিত। এই প্রথা এখনো বর্তমান আছে। একটা সময় ছিল যখন বিয়ের প্রায় শতভাগই পারিবারিক সম্মতিতে অনুষ্ঠিত হতো। ছেলে পক্ষ ঘটা করে মেয়ের বাড়ীতে যেতেন কনেকে দেখতে। কনের বাড়ীতে মেয়ে দেখতে যাবার সময় কখনো কখনো বর সাথে যেতেন। আবার মাঝে মাঝে বরের অনুপস্থিতে মুরুব্বিরা মেয়ে দেখে নিজেরাই বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতেন। মোট কথা হল বিয়ের ব্যাপারে ছেলে মেয়ে দুজনের কারোই মত প্রকাশের খুব বেশী সুযোগ ছিল না বা থাকতো না সেই সময়। বর-কনে দুজনের মধ্যে প্রায় সময়েই কোন কথাবার্তা হতো না এমনকি দেখা-সাক্ষাৎ ও হতো না অনেক সময়। প্রথাগত ভাবে বয়স্ক মুরুব্বীরাই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতেন।
ছেলে পক্ষ কর্তৃক কনে দেখার একটি পুরো দৃশ্যপট আলোচনা করা যাক। স্থান ভেদে এর কিছুটা ভিন্নতা থাকতে পারে। কোন একদিন বর পক্ষের কয়েকজন মুরুব্বী সাথে বরের মা/বোন/ভাবী/দুলাভাই সহ মোট ৭/৮ জনের একটি দল পাত্রী দেখার উদ্দেশ্যে কনের বাড়ীতে রওনা হতেন। এ দলের সাথে বিয়ের ঘটক ও উপস্থিত থাকতেন। বিয়ের পাত্র কোন কোন সময়ে এই দলের সাথে যেতেন। আবার অনেক ক্ষেত্রে যেতেন না। কনে দেখতে যাওয়ার সময় বর পক্ষ সাথে মাটির হাঁড়িতে করে এক বা দুই হাড়ি মিষ্টি/জিলাবী/নিমকি জাতীয় জিনিস নিয়ে যেতেন।
কনের বাড়ীতে পৌঁছার পর সাধারণত বৈঠক খানায় অথবা বাড়ীর মূল ঘরে সবার বসার ব্যবস্থা করা হয় হতো। গরমের দিনে ছোট ছোট বাচ্চারা হাত পাখা দিয়ে বর পক্ষের মুরুব্বীদের বাতাস করতো। শুরুতেই পরিবেশন করা হতো শরবত। সাধারণত কাঁচের গ্লাসে লেবু আর চিনি দিয়ে তৈরী শরবত পরিবেশন করা হতো। সাথে কিছুটা হালকা নাস্তা বা বাড়ীতে তৈরী পিঠা ও দেয়া হতো এসময়। এগুলো খেতে খেতে দুই পক্ষের মুরুব্বীরা প্রাথমিক আলাপ আলোচনা শুরু করতেন।
বাড়ীর ভিতরে তখন চলছে কনে সাজানোর কাজ। সে সময়টায় মেয়েদের বিয়ে অল্প বয়সেই হয়ে যেত। খুব নামী দামী প্রসাধনী তখন সহজলভ্য ছিল না। গ্রামীণ জনপদে মেয়েদের এগুলো ব্যবহারের প্রতি আগ্রহ, সামর্থ্য বা চাহিদা কোনটাই ছিল না তেমন। একেবারেই সাদামাটা কিছু প্রসাধন,একটা নতুন শাড়ি, মা ভাবীদের কিছু অলংকার দিয়ে সাজিয়ে বিরাট এক ঘোমটা মাথায় দিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসা হতো বর পক্ষের সামনে। একাজ গুলো সাধারনত কনের ভাবীরাই করতেন বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে।
কিছুক্ষণ পর কনেকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করতেন কনের ভাবী। লম্বা একটা আসসালামু আয়ালাইকুম বলে কনে আসতো সবার সামনে। এ সময় কোন কোন ক্ষেত্রে কনে উপস্থিত সব মুরুব্বীদের পায়ে ধরে সালাম করতো। আবার কোন কোন সময় এই সালাম পর্বটা হতো না।
এবার শুরু হতো কনে দেখা আর যাচাই করার পর্ব। বিরাট লম্বা এক ঘোমটা দিয়ে কনে বসে আছে মাঝ খানে। খানিক ক্ষণ পর বর পক্ষের কোন এক মুরুব্বী কনের ভাবীকে অনুরোধ করতেন ঘোমটা তুলে কনের মুখটা দেখানোর জন্য। কনের ভাবী বা সাথে থাকা অন্য কোন মহিলা ঘোমটা খুলে মেয়ের মুখটা দেখাতেন উপস্থিত সবাইকে। প্রায় ক্ষেত্রেই কনে এই সময় লজ্জায় চোখ বন্ধ আর মাথাটা নীচু করে রাখতো। কনের জড়তা কাটাতে ভাবীদেরকে তাই মাঝে মাঝে কনের মাথাটা কিছুটা উপরে তুলে ধরতে হতো।
এবার শুরু হতো পরীক্ষা পর্ব। পাত্র পক্ষের কেউ একজন নাম জিজ্ঞেস করতেন পাত্রীর। পাত্রী লম্বা ঘোমটার নীচ থেকে খুবই ক্ষীণ স্বরে আর স্বলাজে বলতেন নিজের নামটা। প্রশ্নোত্তর পর্বে কনের বাড়ীর অন্যান্য মহিলারা দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে বা বেড়ার ফাঁক দিয়ে তা অবলোকন করতেন। তখনকার পেক্ষাপটে সচরাচর কনের মায়েরা এই সময় বর পক্ষের লোক জনের সামনে আসতেন না। আড়াল থেকেই দেখতেন আর শুনতেন আলোচনার এই অংশ।
সাধারণত কনের চুলে বেনী আর খোঁপা করা থাকত। কেউ একজন তখন কনের ভাবীকে অনুরোধ করতেন কনের ঘোমটা সরিয়ে চুলের খোঁপা খুলে দিতে যাতে করে কনের চুলের দৈর্ঘ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা করা যায়।
এর পরের প্রশ্ন, মা পড়াশোনা কতটুকু করেছো? প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন সে সময় পঞ্চম – সপ্তম/অষ্টম শ্রেণীতে পড়া অবস্থাতেই বেশীর ভাগ মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেতো। এই প্রশ্নের উত্তরে বর পক্ষের কেউ কেউ বলে উঠতেন, ঠিক আছে মা। মেয়েদের আর এর বেশী পড়াশোনার দরকার নাই। স্বামীকে চিঠি লিখতে পারলে আর স্বামীর চিঠি পড়তে পারলেই হলো। আর ছোট খাট হিসাব, যোগ বিয়োগ জানলেই আর কিছুর দরকার হয়না। মেয়েদের জন্য এটাই অনেক।
কেউ একজন এবার কনেকে বলেন, মা একটু হাঁটো। এভাবে পরীক্ষা করা হতো মেয়ে খোড়া কিনা বা পায়ে কোন সমস্যা আছে কিনা। তারপর মেয়ের চুলের দৈর্ঘ্য, মেয়ের আরবী জ্ঞান, সেলাই, পবিত্র কোরআন শরীফ পড়া, নামাজ ইত্যাদি জানে বা পারে কিনা তা প্রশ্ন করে উত্তর জেনে নেওয়া হয়। প্রশ্ন করা হয় বেতরের নামাজ কত রাকাত, ফজরের নামাজে কয় রাকাত ফরজ বা তাহাজ্জুদের নামাজ কখন পড়া হয় এই সব। এরপর আসে কনের রান্না বান্নার দক্ষতার প্রসঙ্গ। কেউ কেউ আবার কনে হাতের কোন কাজ জানে কিনা সে বিষয়ে ও প্রশ্ন করেন। এই সময় বাড়ীর দেয়ালে টাঙ্গানো কিছু কিছু সূচিকর্মের দিকে বর পক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। রঙিন সুই সুতো দিয়ে কাপড়ে কাজ করা আর কাঁচে বাধাই এই সমস্ত সূচিকর্মে সাধারণত এগুলো লিখা বা আঁকা থাকতো,
“যাও পাখি বল তারে, সে যেন ভুলে না মোরে”, “সুখে থাকো,” “ভুলনা আমায়”, “মা,” “আল্লাহু”, “দুইটা ময়ুর”, “ডালিম পাকিলে পরে নিজে ফেটে যায়, ছোট লোক বড় হলে বন্ধুরে কাঁদায়”, “যখন তোমার কেউ ছিলনা তখন ছিলাম আমি, এখন তোমার সব হয়েছে পর হয়েছি আমি,” “বিপদে বন্ধুর পরিচয়,” “আবার হবে দেখা” আর এই জাতীয় আরো কিছু কিছু নীতিবাক্য বা খনার বচন।
এই সমস্ত সূচিকর্ম গুলো বিভিন্ন রকম রঙীন সুতা দিয়ে একেবারই কাঁচা হাতে তৈরী করা হতো। কিন্তু এগুলোই ছিলো তখনকার সময়ে বিয়ের পাত্রী হিসেবে মেয়েদের যোগ্যতার একটি উল্লেখযোগ্য মাপকাঠি।
মেয়েকে দেখা আর পরীক্ষা করা শেষ হওয়ার পর কনেকে আবার ভিতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুমতি দিতেন বর পক্ষের মুরুব্বীরা। এর ফাঁকে আবার ছেলে পক্ষের সাথে আসা কোন কোন অল্প বয়সী মেয়েরা কোন ছলচাতুরী করে বা কোন অজুহাতে বুদ্ধি করে মেয়ে পক্ষের বাড়ীর অন্দর মহলে ঢুকে যেতো আর পরীক্ষা করে দেখতো বাড়ীর ভিতরের অবস্থাটা কেমন।
প্রসঙ্গ ক্রমে আরেকটি বিষয় আলোচনায় আসা দরকার। কোন কোন সময় এমনও দেখা গেছে পাত্রী দেখতে খুব ভাল না হওয়ায় পাত্রীর সুন্দরী ভাবী বা অন্য কোন সুন্দরী মহিলা পাত্রী সেজে ছেলে পক্ষকে বিয়েতে রাজী করিয়ে নেন। এরপর বিয়েটা হয়ে যায়। এই বিয়ের পর কোন কোন ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরী হয়। কিছু কিছু বিয়ে পরে ভেঙে যায়। আবার এমনও দেখা গেছে কোন কোন ক্ষেত্রে মুরুব্বীদের হস্তক্ষেপে এই সমস্যা গুলো সুরাহা করে বর কনে জীবন শুরু করে।
কনের পরীক্ষা শেষ। কনের চেহারা, গায়ের রং, পড়াশোনা, আরবী জ্ঞান, ধর্ম-কর্ম, হাতের কাজ, রান্না বান্না, সেলাই জ্ঞান, আদব কায়দা, পর্দা পুশিদা আর হাঁটাচলা এর সবগুলোই দেখা আর পরীক্ষা করা শেষ।
এবার সিদ্ধান্তের পালা। তখনকার সময়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হলে ও বর্তমানের মত হাতে এনগেজমেন্ট রিং পড়ানোর প্রচলন ছিল না। বর পক্ষ সন্তুষ্ট হলে সবাই বলতেন আলহামদুলিল্লাহ। আর মুরুব্বীদের কেউ একজন তখন হাত তুলে ছোট্ট একটা দোয়া করতেন। বাড়ীর ভিতর থেকে মহিলারা ও এই দোয়ায় সামিল হতেন। এরপর দু’পক্ষ মিলে বিয়ের দিন তারিখ নির্ধারণ করতেন। এই সময় আলোচনায় অন্যান্য কিছু কিছু বিষয় ও ঠিক করে ফেলা হতো। বিয়েতে দেনা পাওনা, দেন মোহর, উপহার সামগ্রী, যৌতুক, আগত অতিথির সংখ্যা সহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা এই বৈঠকেই চূড়ান্ত করা হতো।
পাত্রী দেখা শেষ। বিয়ের দিন তারিখ চূড়ান্ত। এবার বর পক্ষের ফিরে আসার পালা। সাধারণত এর পরপরই ফিরে আসতেন বর পক্ষের আগত সদস্যরা। সে সময় সিংহ ভাগ ক্ষেত্রেই কনে দেখার কাজটা হতো দিনের বেলায়। বিদ্যুৎ না থাকায় রাতের বেলা হারিকেনের আলোতে কনে দেখায় অসুবিধা হতো বলেই এই কাজটা দিনের আলোতেই করা হতো। কোন কোন ক্ষেত্রে বিয়ের দিন তারিখ চূড়ান্ত হবার পর বর পক্ষ দুপুরের খাবার খেয়ে আসতেন। তবে সব সময় সেটা হতো না।
যদি কোনো কারণে মেয়েকে বর পক্ষের পছন্দ না হতো সেই ক্ষেত্রে বর পক্ষ সরাসরি উপস্থিত “না” বলতেন না। বলতেন আমরা বাড়ীতে ফিরে গিয়ে সবার সাথে আলোচনা করে আপনাদেরকে এই বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব। দুই তিন দিন পর বিয়ের ঘটক অন্য কোন গণ্যমান্য ব্যক্তির মাধ্যমে তাদের অসম্মতির কথা জানিয়ে দিতেন মেয়ে পক্ষকে।
এভাবেই চূড়ান্ত হয়ে যেত সেই সময়কার মেয়েদের একটি বিয়ে। সম্পূর্ণ অজানা, অদেখা আর অচেনা একজনের সাথে শুরু হতো এক কিশোরীর নতুন জীবন, শুরু হতো নতুন এক পথ চলা, নতুন এক অধ্যায়। ঘোমটা পড়ে শ্বশুর বাড়ী পাড়ি দিতেন আমাদের কিশোরী মরিয়ম, সুফিয়া, জুলেখা, আনোয়ারা আর রহিমারা।
Md. Aowrangazeb Chowdhury
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
১৭ আগষ্ট ২০২১।




