অপরাহ্নে

ধূসর বিবর্ণ সাদাকালো ছবিটা ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে বের করে দেখে আবারো পূর্ণতা। দুটি চোখের শান্ত দৃষ্টি, নির্বিকার ভাবলেশহীন চেহারা। দু’হাতে ক’গাছি চুড়ি আর গলায় মোটা চেইনে গাঁথা পান পাতার লকেট। তাঁর পাশে হাস্যোজ্বল চেহারার এক যুবকের ছবি।

-আপা এসে গেছি।
ড্রাইভারের ডাকে এবং ক্যাঁচকরে ব্রেক করার ঝাঁকুনিতে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে পূর্ণতার। হঠাৎ করে ঝির ঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে খেয়ালই করেনি পূর্ণতা। ক্রমাগত ওয়াইপারে গাড়ির কাঁচের পানি মুছে চলেছে। জানালার গ্লাসটা তুলে সামনে তাকায়।  ছায়া সুনিবিড়, শান্তির নীড়। গাছগাছালির ঘন সবুজে ছেয়ে থাকা চারপাশ। মস্ত গেটটা পেরুলে বিশাল কালো সাইন বোর্ড আঁটা। তাতে সাদা অক্ষরে লেখা “অপরাহ্নে”।
বৃষ্টিটা একটু ধরে আসতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে পূর্ণতা। ইয়া মোটা ভুড়িওলা দারোয়ান অর্ধেকটা গেট জুড়ে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। পূর্ণতাকে দেখে বিরস বদনে হাত তুলে সালাম ঠুকে রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ায়। পূর্ণতা কব্জি উল্টে সময়টা দেখে নেয়। ইশ্ অনেক খানি দেরি করে ফেলেছে। অফিস রুমে নামটা সিগনেচার করে এগিয়ে যায় দুই নাম্বার ওয়ার্ডের দিকে, মহিলা ওয়ার্ড। ধবধবে সাদা নিজ নিজ বিছানার ওপর কেউ শুয়ে কেউ বা বসে। পূর্ণতা রুমে ঢুকতেই সবার মুখগুলি কেমন মায়াবতি হয়ে উঠলো। সেই ছেলে বেলায় মাকে হারিয়েছে পূর্ণতা। মা বেঁচে থাকলে এমন বয়সই হতো। ডাক্তারি পাশ করার পর ওল্ড হোমের এই অফারটা সে লুফে নিয়েছে। অন্তত কয়েক ঘন্টাতো সে মায়েদের সাহচার্য পাবে। এর আগের দুটো ওল্ড হোম সে ঘুরে এসেছে বিশেষ কারনে। মাস খানেক আগে তৃতীয় বিচরণ। তৃতীয় হলে কিহবে পূর্ণতার কাছে সব গুলোই এক ক্ষেত্র, একই অনুভুতি। পৃথিবী যেমন একটাই, মায়ের জাতও একটাই। আর তাই পৃথিবীতে এক মায়ের আঁচলের ছায়ায় পূর্ণতার যথেচ্ছা বিচরণ। কার কত রকমের সুখ দুঃখের ঘনঘটা পূর্ণতার সাথে শেয়ার সবারই। অনেক সময় এমন হয় যে, ডিউটির বাইরেও কত সময় পেরিয়ে যায় এই মায়েদের মাঝেই আটকা পড়ে, উপভোগ করে মাতৃস্নেহেরর ওম। 

মায়েদের নীরবে কান্নায় কিংবা মন উতলা করা কাহিনীতে মিশে যায় পূর্ণতা। মিনতি দাস, রহিমা আখতার কিংবা সুফিয়া আমিন দের কথকতাও একই। শুধু মঞ্চটা ভিন্ন। পুরুষ ওয়ার্ডেও তাই। এক কালের দন্ডমুন্ডের কর্তা, বাড়ি কাঁপানো হুকুম দাতা মানুষগুলোর কি করুণ উপাখ্যান। পূর্ণতা আজ নুরুন্নাহারের কাছে বসেছে। তার সবটুকু জানা হয়নি। একেতো স্বল্পভাষী তার ওপর কঠিন অসুখে ভুগছেন। পূর্ণতা উনার মাথায় হাত রেখে স্নিগ্ধ হাসি ফুটিয়ে বলে,
— অপনজন কে আছে মা আপনার ?

  • কেউ নেই।
    স্ট্রেইট জবাব নুরুন্নাহারের।
  • আপনার ছোট্ট একটা অপারেশন লাগবে। নিয়ম অনুযায়ী আপনজনকে জানাতে হবে। তাই বলছিলাম–
    পাশের বেড থেকে জেবুন্নেসা বলে উঠলেন
  • ওভাবে বলছেন কেন নুরুন্নাহার আপা ? আমরা না হয়  নেই সন্তানদের কাছে কিন্তু আমাদের মাঝে তো ওরা আছে।
    নুরুন্নাহার মাথা দোলালেন।
    — আমার দুই ছেলে।  আমার স্বামী মারা যাবার সময় স্থাবর অস্থাবর সবকিছুই ছেলের নামে করে দিয়ে গেছেন মাকে দেখভাল করার শর্তে।
  • সেই দেখভালটাই বুঝি এই ‘অপরাহ্নে’ হচ্ছে।
  • না রেখে কী করবে ?  স্বপরিবারে প্রবাসে পাড়ি জমিয়েছে যে।
  • এতো গেল এক জনের কথা। আর অন্য ছেলে ?
  • তাকে পাবো কোথায় ? আমিই তো তাকে হারিয়ে ফেলেছি মা।
    এটুকু বলেই দুহাতে মুখ ঢেকে অঝোরে কাঁদতে থাকেন নুরুন্নাহার। পরিবেশটা ভারি হয়ে ওঠে। অন্যান্য মায়েরাও আঁচলে চোখ মুছেন। পূর্ণতা ফিরে আসে অফিস রুমে। একটু পরেই লাঞ্চ আওয়ার।
    চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দেয় শোফাটায়।  কোথায় যেন একটা যোগসূত্র উঁকি দিচ্ছে মনের কোনে।
    একমাসের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি একের পর এক সাজাতে থাকে।

মনটা পাড়ি জমায় কোন এক অতীতে।
আরিফ টগবগে এক যুবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে জয়েন করতে না করতেই বাবা মায়ের শখ ঘরের লক্ষি চাইই চাই। আপত্তিরও কিছু নেই। নির্দিষ্ট ভাল লাগা বা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যও নেই। মোটামুটি সুন্দরি এক মেয়ে দেখে বাবা মায়ের পছন্দেই আরিফের বিয়ে ঠিক হল। তিন কবুলে বৌ ঘরেও নিয়ে এলো। বাবা মাতো মহা খুশি। খুশি আরিফও। কিন্তু বৌ আনত দৃষ্টিতে সারাক্ষণ বিষন্ন।মেরুন সূতোয় বোনা কারুকাজময় শাড়ির আঁচল রান্নাঘরে কুটনা কুটায় কিংবা বাটনা বাটায় ব্যস্ত। মা ভাবেন ভারি লজ্জাবতি মেয়ে কদিন গেলে ঠিক হয়ে যাবে। দিন গড়ায় কিন্তু নতুন বৌ নতুনই থাকে। বৌয়ের লজ্জা ভাঙ্গেনা। আরিফ অফিস থেকে ফেরার পথে জানালার গ্রীলটায় প্রতীক্ষিত কোনো মুখ দেখতে পায়না। কাঙ্খিত চোখ জোড়ায় লাজ বিধুর কোনো হাসিও খেলা করেনা।
বৌ হঠাৎ শয্যা নিল। রান্না ঘরেও যায় না খায়ও না। শাশুড়ি মাথায় হাত রেখে বললেন বৌ আমার দিকে তাকাও। শরীর গুলায় ? বমি বমি লাগে ? বৌ নিঃশ্চুপ। আরিফ জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। ডাক্তারের সহাস্য জবাব – এই টেষ্টগুলো করে নিয়ে আসেন। ডাক্তারের সহাস্য জবাব – অভিনন্দন, বাবা হচ্ছেন। আরিফতো খুশিতে আত্মহারা, কিন্তু বৌয়ের শুকনো মুখ।
বংশধরের আগমন বলে কথা। বেয়াই বাড়িতে খবর পাঠান আরিফের বাবা। সে অঞ্চলের রীতি অনুযায়ী প্রথম সন্তান মাতুলালয়েই হয়। তাতেও বৌয়ের উচ্ছাসের কোনো চিহ্ন নেই। যেন হুকুমের বলি।
যথা সময়ে ঘর আলো করে ফুটফুটে ছেলে এলো। দাদা জোড়া খাসি কেটে আকিকা দিয়ে ‘আহনাফ আরিফ’ নামকরন করলেন। রঙিন সুতায় ফুল পাখি নক্সা তোলা দাদীর হাতের তৈরি কাঁথা আর ছোট ছোট ফতুয়া জামায় ভরে গেল কাপড়ের আলমারি। এবার পিতৃগৃহে আহনাফের ফেরার সময় হল। আরিফ আনতে গিয়ে ফিরে এলো শুধু মাত্র শিশু আহনাফকে নিয়ে। আরিফের মা আঁতকে উঠলেন বৌ কোথায়?
আরিফ শুধু বললো – নেই। আরিফ কাউকে কিছুই না বললেও ঘটনাটা জানাজানি হয়ে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। বৌ পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে না গেলেও, সন্তান স্বামী এবং বাবা মায়ের মান সম্মানকে ধূলায় লুটিয়ে দিয়ে পূর্ব প্রেমিকের হাত ধরে নিরুদ্দেশ হয়েছে।
স্বাভাবিক ভাবেই আরিফের দ্বিতীয় বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়েছেন বাবা মা । আরিফ অটল অনড় কন্ঠে বলেছে—
আহনাফের মা নেই। আমিও যদি পর হয়ে যাই ওর কী হবে ?
আরিফ বাবা মা উভয়েরই ভুমিকায় সুনিপুন যত্নে আদরে শাসনে হাঁটি হাঁটি পা পা ছেড়ে নিজ পায়ে আহনাফকে দাঁড় করিয়ে দেয়, স্কুল কলেজ এবং মেডিকেলের গন্ডি পাড়ি দিয়ে। ঢাকার অদুরে এক স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জয়েন করে আহনাফ। আরিফের চাকরি প্রায় শেষের দিকে। জীবনের এতোটা সময় একা একা ক্লান্তিহীন ছুটাছুটি করে আজকাল একটুতেই অবসন্নতা ঘিরে ধরে।
আহনাফের পছন্দের ক্লাশ ফ্রেন্ড পূর্ণতাকে বৌ এর মর্যাদা দিয়ে ঘরে তোলেন। অল্প কিছুদিনেই পূর্ণতা অরিফের সার্বক্ষণিক কেয়ারটেকার হয়ে ওঠে। আরিফের শরীরটা কিছুদিন থেকে ভাল যাচ্ছিলনা। পূর্ণতাকে একা পাশে বসিয়ে বললেন

  • আমি একটা দায়বদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে চাই। তুমি কী আমাকে সাহায্য করবে বৌমা ?
  • কী সাহায্য বাবা ?
  • একটা মেসেজ তোমার কাছে রাখছি। তুমি যেভাবে পারো আহনাফকে বলবে।
  • বলুন বাবা।
  • আহনাফের মা মারা যায়নি, আজও বেঁচে আছে।
  • তড়িতাহত হয় পূর্ণতা, বেঁচে আছে ! কোথায় আছে ?
  • শুনেছি তার স্বামী মারা যাবার পর কোনো এক বৃদ্ধশ্রমে রেখেছে সন্তান।
    ঠিক এসময়ে আহনাফের আগমনে আরিফ প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বলেন
  • তোমরা দুজনকেই বলি, আমি কাল দেশের বাড়ি যাবো ভাবছি।
    আহনাফ এবং পূর্ণতা দুজনেই বাবার শরীরের এ অবস্থায় রাজি হয়না। আর কি অশ্চর্য ব্যপার এর কদিন পরেই আরিফ হঠাৎ করে স্ট্রোক করলেন, আর উঠলেন না।
    পূর্ণতা আহনাফকে  শোকের এ সময়টায় শ্বশুরের রেখে যাওয়া মেসেজটা কিভাবে দিবে ভাবতে থাকে আর নিজেই বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বিভিন্ন বন্ধুবান্ধবের সহায়তায় খুঁজে ফিরে তার শাশুড়িকে। কিন্তু নামহীন ব্যক্তিকে খুঁজবে কিভাবে। কমাসের অদমনীয় প্রচেষ্টায় এক স্থান থেকে আর এক স্থানে এভাবেই চষে বেড়ায় পূর্ণতা। হঠাৎই  শ্বশুরের পুরোনো একটা ফাইলে বিবর্ন  ছবিটি আবিষ্কার করে কিন্তু বুঝে উঠতে পারেনা। শশ্রুমন্ডিত যে শ্বশুরকে সে দেখেছে তার দৃষ্টির সঙ্গে ছবির যুবকের দৃষ্টির কিছু মিল খুঁজে পায়। তবে কী – – ভেবে, ছবিটি রেখে দেয় হাত ব্যাগে।

ঝিমুনি কাটিয়ে সোজা হয়ে বসে পূর্ণতা। হাতব্যাগের ছবিটি মেলে ধরে। ছবির মহিলাটিকে পর্যবেক্ষণ করে এবার। এক মুহুর্ত। এক ছুটে নুরুন্নাহারের কাছে। দুবাহু তুলে নুরুন্নাহারকে সোজা করে বসিয়ে ছবিটা মেলে ধরে।

  • মা এদের চিনতে পারেন ?
    নুরুন্নাহারের কোটোরাগত বসে যাওয়া  চোখদুটি অনেকক্ষন পর্যবেক্ষনের পর উজ্জ্বল হয়
  • এ ছবি তুমি কোথায় পেলে ?
    পূর্ণতা কোনো জবাব দেয় না। ছবির মেয়েটির ভাসা ভাসা দৃষ্টির সাথে নুরুন্নাহারের দৃষ্টির  কোনো মিল খুঁজে পায়না। কিন্তু কপালের বাঁ পাশের কালো তিলটা আর ডান ভ্রুতে কাটা দাগটি হুবুহু এক। আর বলে দিতে হয়না কিছু। নুরুন্নাহারের শীর্ণ হাত পূর্ণতাকে চেপে ধরে
  • আরিফের ছবি তুমি কোথায় পেলে ?
  • উনার কাছেই।
  • তুমি কে মা ?
    পূর্ণতা জবাবটা না দিয়েই বেরিয়ে যায়। আহনাফকে জানাতে হবে শ্বশুরের রেখে যাওয়া মেসেজটা।  মা মারা যান নি। আছেন, খুব কাছেই আছেন।

Fahmida reea.

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!