ক্রমহ্রাসমান সামাজিক অনুশাসন ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা

একটা সময় ছিল যখন আজকের মত এত আইন কানুন, কোর্ট কাচারী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছিলো না। ‌অথবা থেকে থাকলেও তার প্রয়োগের মাত্রা ছিলো খুবই সীমিত পর্যায়ে।‌ তখনকার সময়ে সমাজ মূলত নিয়ন্ত্রিত হতো সামাজিক অনুশাসনের মাধ্যমে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, বড়দের প্রতি সম্মান, ন্যায় নীতি, সুবিচার, নীতি নৈতিকতা, পক্ষপাতহীনতা এগুলো সমাজে প্রচলিত ছিল ব্যাপক ভাবে।

বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সমাজের অন্যান্য সদস্যদের শ্রদ্ধা ছিলো প্রশ্নাতীত। সে সময়ে স্কুল শিক্ষকদের মর্যাদা ও ছিল অনেক উঁচুতে। যে কোনো সমস্যায় সমাধানের জন্য লোকজন ছুটে যেতেন পাড়ার মুরুব্বী বা বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছে। সংশ্লিষ্ট দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে সমাজের বয়োজ্যেষ্ঠরা একটি সিদ্ধান্ত দিতেন যা সংশ্লিষ্ট সবাই মেনে ‌নিতেন। এই সমস্ত সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষেত্রে সমাজের মুরুব্বীরা প্রচন্ড নিরপেক্ষ থাকতেন এবং নিশ্চিত করতেন সঠিক ও ন্যায় বিচার।

সব সময়েই যে তাঁরা সঠিক ভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করতেন সেটা নিশ্চিত করে বলা হয়তো ঠিক হবে না।‌ তবে এক্ষেত্রে ব্যতয় ঘটলে ও তা ছিল সামান্যই। অনেক ক্ষেত্রে সেটা আবার হয়তো হতো অনিচ্ছা সত্ত্বে। এমনও দেখা যেত যদি তাঁদের বিচার কার্যে কখনো কখনো ভুল ও হয়ে যেতো, সেই ক্ষেত্রে কোন কোন সময় সব পক্ষই তাঁদের দেয়া সিদ্ধান্ত মেনে নিতেন। এটা করার পেছনে কারণ ছিল তাঁদের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধাবোধ আর বিশ্বাস।

বয়স্কদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রদর্শনে তখন কোন শ্রেণীভেদ ছিল না। যে কোনো পর্যায়ের বয়স্ক ব্যক্তিদের ছোটরা সব সময়েই সম্মান করতো, শ্রদ্ধা করতো, মেনে চলতো তাঁদের আদেশ নিষেধ আর উপদেশ।‌ এখানে আপন পর, কাছের দূরের, আত্মীয় অনাত্মীয়, শিক্ষিত অশিক্ষিত বা অন্য কোন কিছুর ভিত্তিতে কোন প্রকার ভেদাভেদ করা হতো না।‌

তখনকার বিরাজমান পরিবেশ, পরিস্থিতি আর সামাজিক অনুশাসন সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করত বহুলাংশে। মানুষের মধ্যে আজকালকার মত এত বিভাজন ছিলনা। ছোটরা বড়দেরকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা করতেন। তখন যে কোন পর্যায়েই শিক্ষকরা ছিলেন সমাজ অত্যন্ত প্রিয় আর শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। সেই সময়টায় এই সামাজিক অনুশাসনের মাধ্যমেই সমাজে একটি সুন্দর ভারসাম্য বজায় থাকতো। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি রক্ষার জন্য বাইরের কোন সহায়ক শক্তি বা সরকারী হস্তক্ষেপের প্রয়োজন কখনোই তেমন জোরালভাবে অনুভূত হয়নি।

সমাজ এগিয়েছে। কারিগরী উৎকর্ষতা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ‌ এই বাস্তবতায় মানুষের মূল্যবোধ, আচার আচরন আর দৃষ্টিভঙ্গিতে ও পরিবর্তন এসেছে ব্যাপক। সামাজিক অনুশাসনের বদলে ধীরে ধীরে সমাজ নিয়ন্ত্রণের ভার প্রায় শতভাগ চলে যাচ্ছে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংস্থা গুলোর হাতে। তবে এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে আফ্রিকায় আর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোট, বড় বা মাঝারী আকারের উপজাতীয়দের মধ্যে এখনো সামাজিক অনুশাসনের কিছুটা প্রচলন ও প্রাধান্য দেখা যায়।

এ কথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না যে, যেই সামাজিক অনুশাসন যুগ যুগ ধরে সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে, বজায় রেখেছে সমাজের ভারসাম্য এখনকার সমাজে তা মূল্যহীন, অর্থহীন বা প্রয়োগের ক্ষেত্রে অকার্যকর। সামাজিক অনুশাসনের বদলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে সে প্রশ্ন করাটা একবারই অবাস্তব নয় বলেই মনে হয়।

সমাজের অগ্রগতির সাথে সাথে নিয়ম নীতির পরিবর্তন হবে ব্যাপকভাবে। আর এটাই স্বাভাবিক। তবে সমাজ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক অনুশাসন যে একটি অত্যন্ত সুন্দর, কার্যকর আর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা সেটা অস্বীকার করার জো নেই। দুঃখজনক ভাবে আমাদের ইচ্ছাকৃত আর অনিচ্ছাকৃত বিভাজন সামাজিক অনুশাসনকে ঠেলে দিয়েছে দূরে, বহু দূরে।

মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১।

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Aowrangazeb Chowdhury
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!