“মাদারফা*”!
জিহান ওর ২০১৯ ফোর্ড ফিউশনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলো। রাস্তার পাশে দাঁড়ানো পথচারীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝলো যে শব্দটা গাড়ির মালিকের প্রতিই উচ্চারিত হয়েছে। জানালা বন্ধ থাকায় সে প্রকৃত অর্থে শুনতে পায় নি। কিন্তু এই শব্দটার সাথে সে এতোটাই পরিচিত যে কেউ মুখে আওড়ালেই সে বুঝে উঠতে পারে; সে মোটামুটি লিপ রিডারের মতোই দক্ষ হয়ে গেছে এই শব্দটার ব্যাপারে।
পথচারীর মুখ থেকে এই শব্দ কেন আসলো সেটা বুঝতে অবশ্য ওর খুব বেশি সময় লাগলো না। ঢাকা শহরের রাস্তা আর বর্ষাকাল খুব বাজে একটা কম্বিনেশন। সিংহ রাশি আর মীন রাশির যুগলের প্রণয় পরিণয়ে গড়ানো যতটা দুঃসাধ্য, ঢাকার রাস্তায় বর্ষাকালে গাড়ি চালিয়ে পথচারীর গায়ে ঢাকার নগর পরিকল্পনার আশির্বাদধন্য রাস্তার খানাখন্দের জমানো কাদা আর পানির কিম্ভূত অসমসত্ত্ব মিশ্রণ না লাগিয়ে চলা তারথেকেও দুঃসাধ্য ব্যাপার। সেটাই ঘটেছে এবেলা। এবং, সেই কারণেই পথচারীর মুখনিঃসৃত এই শব্দ। জিহান মনে মনে সেই পথচারীর কাছ থেকে স্যরি বলে নিলো।
সকালে বৃষ্টিটা না হলে ওর ঘুম আরও আগেই ভাঙতো এবং অফিসের জন্য সে ঠিক সময়েই বেরুতে পারতো। আর অফিসে যাওয়ার জন্য এই শর্টকাট রাস্তাও তখন খুঁজতে হতো না, সবসময় যে রাস্তা ধরে যায় সেই রাস্তাতেই অফিসে চলে আসা যেতো। তাতে করে এই বেচারা পথচারীর সাথে দেখাও হতো না আর তার গায়ে রাস্তায় জমা হওয়া পানিও ছিটকে পড়তো না। সো, সব দোষ এই বৃষ্টির। জিহান এরকমই ভাবছিলো। কিন্তু বৃষ্টিকে এখন আর দোষ দেয়া যাচ্ছে না। বৃষ্টি প্রৈতীর খুব পছন্দ। আর জিহানের পছন্দ প্রৈতী। মেয়েটা খুব মায়া ছড়াচ্ছে ইদানিং। আর জিহান তাতে গলা পর্যন্ত ডুবে গেছে।
জিহানের ড্রাইভার সামাদ ভালো ড্রাইভ করে। জিহান এমনিতে আর কাউকে ওর গাড়িতে হাত দিতে দেয় না। কিন্তু অফিস যাওয়ার সময় ঢাকার জ্যামে আটকে থাকলে ওর হাত নিশপিশ করে ট্রাফিক অগ্রাহ্য করে যেতে। মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওকে ড্রাইভার নিতে হয়েছে। কপাল গুণে এমন একজন ড্রাইভার জুটেছে যে আবার ভালো ড্রাইভারই না, ভালো মানুষও। ওর অভিজ্ঞতায় যেটা খুবই বিরল একটা ব্যাপার। এই ড্রাইভার রাস্তা চেনে। রাস্তার নিয়ম জানে। স্পিড লিমিট মানে। আবার হাত খুলেও চালাতে জানে। সবথেকে বড় ব্যাপারটা হলো গাড়ির যত্ন নেয়াটা সে খুবই আন্তরিকতার সাথে করে। জিহান সামাদকে একারণে খুবই পছন্দ করে। গাড়ি চালানোর সময় সামাদের পূর্ণ মনোযোগ থাকে রাস্তার দিকে। জিহান যাকে বলে একেবারে নিশ্চিন্ত মনে পিছনে বসে থাকে। আর প্রতি সকালে পিছনে বসে সে “দুনিয়ার যাবতীয় বিষয়” নিয়ে চিন্তাটা সেরে নিতে পারে। যেটা সে এখন করছিলো।
স্মার্টফোনের হেডসেট প্লাগ ইন করা। ওর খুব পছন্দের একটা গান বাজছিলো। ওর প্লেলিস্ট সাফল প্লে করা থাকে। কিন্তু আজ এমন সব গান একটার পর একটা আসছিলো যেগুলো ওর খুবই পছন্দের। সচরাচর এমনটা হয় না। “দিস ইজ গোয়িং টু বি এ ভেরি ইন্ট্রেস্টিং ডে”, জিহান ওর ঠোঁটে এক চিলতে হাসি নিয়ে ভাবলো। এসপ্রেসো আর ওয়াফল দিয়ে সকালের নাস্তাটাও চমৎকার হয়েছে। অফিসে তেমন কাজও নেই আজ। দুপুরের পরপরই হয়তো বেরিয়ে আসতে পারবে। প্রৈতীর সাথে বিকেলে দেখা করা যেতেই পারে। মেয়েটার সবই ভালো, শুধু ইয়ং অ্যাডাল্ট পড়ে পড়ে মাথাটা খেয়ে ফেলছে। এভ্রি ইয়ং অ্যাডাল্ট নোভেল হ্যাজ দ্য সেম ফাকিং প্লটলাইন। হিরো অ্যান্ড হিরোইন ওভারকাম অবস্টাকলস অ্যান্ড ফাইন্ড ট্রু লাভ। অথবা, ডাইস্টোপিয়ান সেটিংস। বাট, দে আর মেসমারাইজিং, স্পেশালি হোয়েন ইয়োর ওয়ার্ল্ড ইজন্ট। জিহান সেদিন প্রৈতীকে বলছিলো, ইউ আর নট এ টিনেজার অ্যানি মোর। ওয়ান ডে ইউ উইল রিয়েলাইজ লাইফ অন আর্থ ইজ নট মেসমারাইজিং অ্যান্ড অল দোজ ইয়ং অ্যাডাল্ট’স প্লট উড সিম পয়েন্টলেস টু ইউ। প্রৈতী চোখ ফুলিয়ে বলেছিলো, সো ফাকিং হোয়াট? তুমি তো আছোই। দ্য সেন্টার টু মাই সার্কেল। “প্রৈতী, তুমি খুউউব প্রীটি”, জিহান মৃদু হেসে বলেছিলো। “আই নো”, এটা ছিলো প্রৈতীর উত্তর। সো ইয়ং অ্যাডাল্ট, জিহান ভাবছিলো।
আজকের সকালটা থাকুক। জিহান ভাবছিলো। ওর ভাবনা প্রৈতী থেকে ঘুরে গেলো আরেকদিকে। নোভেল নিয়ে চিন্তা করতে করতে হুট করে ফোনে একটা অ্যালার্ট আসলো। ফেসবুক নোটিফিকেশন। জাকারবার্গ জগিং করছে। এটা নিয়ে একটা মিম। “ম্যান, ইউ ডিজার্ভ টু বি ইন এভ্রি সিঙ্গেল মিম আউট দেয়ার”, জিহান মনে মনে বলে উঠলো। লাস্ট ইয়ার ফেসবুক মোট ২২.৬ মিলিয়ন ইউএস ডলার খরচ করেছে জাকারবার্গের “সিকিউরিটি” রিজনে। কিসের এতো ভয় তোমার? আমাদের সব ডাটা তো তোমাকে দিয়েই দিয়েছি। বেচে খাও আর বেঁচে থাকো!
জিহানের চিন্তা এগুচ্ছিলো এভাবেই। পছন্দের গানগুলোও বেজেই চলছিলো। এমন একটা গান বাজছিলো, জিহানের খুব পছন্দের মেটালকোর একটা ট্রাক যেটার গিটার সলোটা, ওর ভাষায়, ইয়ারগ্যাজমিক। সেই গানটাই চলছিলো। আর সেই গিটার সলোটা আসছে। এই আসলো…
ঠিক এই অন্তিম মুহূর্তে সামাদ ডেকে উঠলো, “বস, অফিস চলে আসছি।”
চিন্তামুগ্ধ আর গিটার সলো শোনার অপেক্ষায় উদগ্রীব থাকা জিহানের মুখ দিয়ে তখন একটাই শব্দ বেরিয়ে আসলো। “মাদারফা”!








hi