নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল
২.
দু’জন একে অপরের পাশাপাশি হেঁটে চলছে । ক্যাম্পাসের সবুজ মাঠ পেরিয়ে ভার্সিটির গেইটের বাইরে এসে দাঁড়ায় দু’জনে । সে আশেপাশে তাকিয়ে শ’মিটার খানিক দূরে একটা রিক্সা দাঁড়িয়ে দেখতে পেয়ে একটু জোরেই হাক ছুঁড়ে,
” ড্রাই-ভার মামাআআআ… ওওও ড্রাইভার মামা… এদিকে, আরে মামা এদিকে… “
ডান হাতটা উপরের দিকে ওঠিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে বলে ।
কাজের ক্ষেত্রে কোন কাজই ছোট নয় । হোক তা ন্যাশনাল বা মাল্টি- ন্যাশনাল অফিসের উচ্চপদস্থ কোনো চাকরি কিংবা কোনো খেটে খাওয়া দিন মজুররের যে কোন কাজ । একজন ন্যাশনাল বা মাল্টি- ন্যাশনাল অফিসের উচ্চপদে কর্মরত ব্যক্তি তার কাজের জন্য যেমন সম্মান পেয়ে থাকেন, তেমনি একজন খেটে খাওয়া দিন মজুরেরও তার কাজের জন্যও ঠিক ততোটুকু সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে । শুধুমাত্র একেক কাজের ভাবার্থে উচ্চপর্যায় থেকে নিম্নপর্যায় পরিমাপ করা হয় । যা সমাজের অতি প্রাকৃতিক তুচ্ছ নিয়ম যা সৃষ্টি হয়েছে কিছু হীন মস্তিষ্কের মানুষের আদলে । একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যেমন পেটের দায়ের পাশাপাশি একটু উন্নত জীবনযাপনের জন্য চাকরি করে ঠিক তেমনই খেটে খাওয়া একজন দিন মজুরও পেটের দায়ে কিছু খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার জন্যই কাজ করে । হোক সেটা একটা ঠেলাগাড়িতে মালপত্র চালানো কিংবা পায়ের জুতো সেলাই করে তা আবার পুনরায় পায়ে পরিধান করার উপযোগী করে তোলা । তারা ভুলে যায়, কাজের জন্য উচ্চপদে কাজ করা ব্যক্তিটি যেমন অন্যের পায়ের জুতো পুনরায় সেলাই করে পায়ে পরিধান করার উপযোগী করতে পারবে না, ঠিক তেমনি একজন জুতো মেরামতকারী মুচির পক্ষেও সম্ভব নয় কোন অফিসের উচ্চপদস্থ ফাইল-পত্র, কম্পিউটার ঘাটাঘাটি করে কাজ করা । কিন্তু, কাজের ভিত্তিতে উভয় ব্যক্তিই সমান গুরুত্বপূর্ণ । কারণ, রাস্তায় হাঁটার সময় হুট করেই সদ্য নতুন কিনে আনা জুতোটা জনসম্মুখে ছিঁড়ে গেলে বোঝা যায় তখন ঐ খেটে খাওয়া দিন মজুর মুচি ব্যক্তিটা কতোটা গুরুত্বপূর্ণ ছেঁড়া জুতো সেলাই করে তা আবারও পায়ে পরিধান করার জন্য । একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যখন ছেঁড়া জুতো হাতে রাস্তায় খালি পায়ে হেঁটে যায়, তখন নাকি সমাজে তাদের সম্মানহীনতা এবং মাথা নিচু হয়ে যায় । অথচ সেই দিন মজুর মুচি অন্যের পায়ের সামনে মাথা নুইয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনে নিজের আর পরিবারের মুখে দু’বেলা দু-মুঠো ভাত জোগান দিতে দিনরাত এক করে কাজ করে । অথচ ঐ দিন মজুর মুচিটির সম্মান যাচ্ছে না সমাজে সম্মানহীনতা বা মাথা নিচু হয়ে যাচ্ছে না । বিষয়টা হাস্যকর না? বরং বেশ খানিকটা হাস্যকরই বটে ।
এ জন্যই সে একজন রিক্সাচালককেও তার প্রাপ্য কাজের জন্য যথাযথ সম্মান দেয় । লোকে যখন,
” এই রিক্সা, ওই রিক্সা… যাইবা?” বলে ডাকে তখন সে ঠিক তার উল্টো কাজটিই করে । বরং একজন রিক্সাচালককেও সে ড্রাইভার মামা বা চাচা বলে ডাকে । কথাটা যখন আশেপাশের নিম্ন মস্তিষ্কের মানুষগুলো শুনতে পায় তখন তাকে নির্ঘাত মাথার তার ছিঁড়ে গেছে বলে উপাধিতে ভূষিতও করে ।
একবার তো একজন ভদ্রলেক রাস্তায় পাশ কেটে যাওয়ার সময়,
” ভাই! রিক্সাওয়ালাকে ড্রাইভার বলছেন কেন?” কথাটা বলে জিগ্যেস করেই বসে । সেদিন ভদ্রলোকটির প্রতি উত্তরে সে শুধু তার সেই সুন্দর চোখ ঝলসানো হাসিটা দিয়েই জবাব দিয়েছে । সেই ঝলসানো হাসিতেই ভদ্রলোক থ – বনে গিয়ে গিয়েছেন বটে ।”
হঠাৎ পেছন থেকে ইধান্ত বলে ওঠে,
” আর্দ্র! ভাই ভাবিকে কি ছেড়ে দিয়ে আসতে যাচ্ছিস?” বাইকের গিয়ারে চাবি ঢুকিয়ে বাইক স্টার্ট দেওয়া আগে কথাটা জিগ্যেস করে ।
আসলে ওর নাম আর্দ্র নয় । আসল নামটা ছোট করে আদর করে শুধুমাত্র ইধান্তই ‘ আর্দ্র ‘ বলে ডাকে । যদিও আর্দ্র আর ইধান্ত একই ব্যাচের এবং একে অপরকে বন্ধুও বটে । বিশেষ ক্ষেত্র প্রয়োজনে ভাইয়ের মতোই সম্মান শ্রদ্ধা রেখেই সাথে ভাই কথাটা যোগ করে বলে ।
” হ্যা, রে এমনি… তুই কিছু বলবি?” সে ইধান্তকে উদ্দেশ্য করে জিগ্যেস
করে ।
” এখন তো ভা-… আচ্ছা, তাহলে সন্ধ্যার পরে ফ্রী হলে একটা মিসকলড
দিস । পরে বলবো ।”
” আচ্ছা, ঠিক আছে ।”
এর মাঝে রিক্সা এসে দাঁড়ায় ওদের সামনে । সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” রিক্সায় ওঠো ।”
মুচকি হেঁসে সে রিক্সায় ওঠে বসে । রিক্সাওয়াকে সে উদ্দেশ্য করে বলে,
” ড্রাইভার মামা… ওকে সাবধানে বাসায় পৌঁছে দিও ।”
রিক্সাওয়ালা খানিক মধ্যবয়স হওয়ায় বলে ,
” আইচ্ছা… বাজান ।” মাথাটা উপর নিচ করে কথায় সায় দেয় ।
রিক্সা চলতে শুরু করতেই কেন যেন সে হঠাৎ পেছন থেকে ডেকে ওঠে,
” প্রণয়িনী !” খানিক আতংক ভরা গলায় বলে ।
সে রিক্সায় বসেই হন্তদন্ত হয়ে মাথাটা খানিক বের করে,
” হ্যাঁ, বলো ।” অধির আগ্রহে পেছন ফেরে বলে ।
” না । কিছু না ।”
” আ-চ্-ছা… “
সে আবার জোর গলায় বলে ,
” আচ্ছা, শোন…।”
” হুম !” খানিক চমকে বলে ।
” ওদিকে দেবাংশুর কি খবর সময় করে জানিও ।”
” আচ্ছা ঠিক আছে । ফ্রী হয়ে তোমাকে ফোন করবো । চিন্তা করো না ।”
” আচ্ছা, এবার যাই তাহলে?”
” হুম… “
সে কথায় সায় দিয়ে সম্মতি জানায় মাথা উপর নিচ করে দুলিয়ে । তারপর রিক্সাওয়ালাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” মামা… এগোও ।”
নিয়মের বেড়াজালের বাঁধনে রিক্সা আবারও নিজের নিয়মে চলতে শুরু করে । সে অপলক তাকিয়ে থাকে চলতে থাকা রিক্সার দিকে । তার মনে হতে থাকে কেউ যেন বুকের ভেতরে আগুন জ্বলিয়ে দিয়েছে । ফাঁকা মাঠে যেন একা দাঁড়িয়েই জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে পুড়ে খাক হয়ে চলছে সে । তৃষ্ণার্ত কাকের মতো শুকনো গলায় একটা ঢোক গিলে, বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কপালের নোনা বিষাদের ঘাম মুছে ফেলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ।
কাঁধের উপর কারো স্পর্শ পেয়ে সে চমকে ওঠে । বাম কাঁধের দিকে তাকাতেই দেখে ইধান্ত পাশেই দাঁড়িয়ে আছে । সে গড়গড় করে বলে,
” আরে… তুই এখনও যাসনি যে?”
” ভাই… কিছু হয়েছে কি?”
” হুম… ” আনমনেই সে বলে ওঠে ।
” কি হয়েছে ভাই?”
” হ্যাঁ, না । না… কিছু না ।”
ইধান্ত পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়,
” দেবাংশুর আবার কখন কি হলো? হয়েছে তো… ” কথাটা শেষ না করেই ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে থাকে ।
” মানে?”
” ভাবি যে একটু আগে বললো?”
” ওহ্! আচ্ছা, ওকে তো মিথ্যে বলেছি দেবাংশুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে । তুই যেন কি বলেছিলি?”
” কিন্তু, কেন ভাই? তুই তো কখনো ভাবিকে মিথ্যে বলিস না । তাহলে?”
” হ্যাঁ, আজ বলেছি । যখন বলেছি তখন নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে ।”
” যাই বলিস আর তাই বলিস না কেন আজকাল তোর আড়ালে বলা মিথ্যেগুলো সত্যিই হয় । শুধু সেটা তোর জানা থাকে না যে তুই অর্ধেক সত্যি হলেও বলিস ।”
সে ভ্রু-জোড়া কুঁচকে জিগ্যেস করে,
” কি বলতে চাইছিস তুই?”
ইতঃস্তত বোধ করতে করতে,
” দেবাংশুর অ্যাক্সিডেন্ট হয়নি । বরং অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে… ” ইধান্ত অস্ফুট গলায় বলে ।
সে খানিক জোড় গলায় আবারও জিগ্যেস করে,
” বল্… কার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে?”
” শু… শু-ভে-… “
কথাটা ইধান্তকে শেষ করতে না দিয়েই সে ক্ষুধার্ত চিলের মতো ছোঁ-মেরে নিয়ে বলে,
” শুভেন্দু!”
#চলবে…
Send private message to author






