আব্বু!

  • ” কাব্যমনি!”
  • ” আসসালামু আলাইকুম আব্বু!”
  • ” ওয়ালাইকুম আসসালাম। ভালো আছ আম্মু? হলে আছ?”
  • “জ্বি আব্বু, হলে আছি। তুমি কোথায়?”
  • ” আচ্ছা, আমি এই যে মন্ত্রণালয়ে একটা মিটিং এ এসেছিলাম। তুমি ফ্রী আছো? আমি ৫/৭ মিনিটের মধ্যেই হলের সামনে আসছি।”
  • ” হ্যাঁ আব্বু আসো। আমি নিচে নামছি।”

আব্বুর সাথে কথা বলে আমি রেডি হতে গেলাম। ঢাকা এসে যতবারই আব্বু আমাকে দেখে যায় বাসায় যেয়ে আম্মুর কাছে নাকি খুব দুঃখ করেন আহারে মেয়েটা শুকায় গেছে! চেহারাটা মলিন হয়ে গেছে! ইশ নিজের যত্ন নেয় না! আরো কত কী! এদিকে আমার আম্মাই মনে হয় দুনিয়ার একমাত্র মা আমি বাসায় গেলে যিনি বলতেন ” হলের খাবার খেয়ে খেয়ে তুই এত মোটা হইছিস!?”
এদিকে আব্বুর হাহুতাশ শুনে আম্মু আবার আমাকে ফোন দেয়

  • ” কীরে! তোর আব্বু দেখতে আসলে একটু সুন্দর করে দেখা করতে পারিস না?”
  • ” কি হলো আবার?”
    -” তোর আব্বুর মন খারাপ হয় । তুই নাকি একটুও ফিটফাট থাকিস না, ফকিরের মতো চেহারা হইছে!”
  • ” জীবনেও আব্বু একথা বলবেনা আম্মু!”
  • ” কোন কথা?”
  • ” ওই যে বললে ফকিরের মত চেহারা হইছে?”
  • ” যাই হোক, তোর আব্বু ভদ্র ভাষায় তোকে ফকির বলছে আর কি! এরপর তোর আব্বু গেলে সুন্দর সুন্দর জামা পরে দেখা করবি, মুখে একটু পাউডার দিবি, পারলে হাল্কা লিপস্টিকও দিস!”
  • ” পারবো না এত কিছু করতে!”

আম্মুকে মুখের উপর ঠিকি বলছি পারবো না করতে, কিন্তু মনের ভিতর হালকা একটা খোচা দিলো। আচ্ছা এরপর আব্বু আসলে সুন্দর হয়ে দেখা করবো।

আমি শুধু ড্রেসটাই চেঞ্জ করলাম। আর কিছু করার ধৈর্য হলো না। আব্বু হলের বাইরে অপেক্ষা করছেন। দৃশ্যটা ছিল এমন- আব্বু এসে হলের গেটের সামনে বড় গাছটার পাশে সবসময় এমনভাবে দাড়াবেন, আমি হলের ভিতর থেকে বাইরে আসতে আসতে দূর থেকে দেখতে পারি স্বভাবসুলভ স্কাই অথবা ব্লু শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা একজন ছোটখাটো মানুষ কত আবেগ আর আনন্দ নিয়ে মেয়েকে দেখার সময় গুনছেন!

আমাদের শামসুন নাহার হলের গেটের দাদু থেকে শুরু করে বাইরে আম মামা, জাম মামা, তরমুজ মামা, আনারস মামা, এমনকি জুতা সেলাই করা শিপনদা পর্যন্ত সবারই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল যে ইনি হলেন হলের কাব্য আপার আব্বা!

যাইহোক, আমি কখনোই আব্বুর গা ঘেষা ছিলাম না। সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতাম। কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর আমি লক্ষ্য করলাম আব্বুর সাথে আমার সেই ‘ইয়েস স্যার’,’ ইয়েস স্যার’ সম্পর্কটা কমে গেছে। আব্বু আমাকে দেখতে আসলেই আমার কান্না আসে! হলের গেটের বাইরে আসতেই আব্বু আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে জিজ্ঞেস করেন ” কেমন আছ আম্মু?” আমি লজ্জায় মারা যাই, এত বড় মেয়েকে কেউ এভাবে আদর করে আব্বু! আশেপাশের সবাই বাবা- মেয়ের দেখা করার দৃশ্যটা বিরতিহীনভাবে দেখে যায়…

আমি সিলেট থেকে এসে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হলাম আর আব্বু ঢাকা কলেজ থেকে ট্রান্সফার হয়ে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন। আবারো আমাদের দূরত্ব! বলতে গেলে প্রতি সপ্তাহে আব্বুর শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের মিটিং এ আসা হতো। হয়তো এসে মিটিং করে একই দিনে সিলেট ব্যাক করতেন। তাই বেশিরভাগ সময়ই আব্বুর সাথে আমার দেখা হতো ১০/১৫ মিনিটের জন্য।
আব্বুর গাড়ি চালাতেন আমাদের জাফর ভাই। জাফর ভাই আব্বুর মন জয় করে ফেলেছিলেন। অফিসের কাজে বেশিরভাগ সময় গাড়িতে কাটানোর ফলে জাফর ভাইয়ের সাথে আব্বুর এবং আমাদের সম্পর্ক ছিলো পরিবারের মতো। আমার ধারণা আব্বুর সাথে থাকতে থাকতে জাফর ভাইয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অর্ধেকই জানা হয়ে গিয়েছিল!

আমি আব্বুকে নিয়ে কোনদিন হলের সামনে বসার সাহস করিনি, পাছে কোন কপোত-কপোতী না আবার আব্বুর চোখে পরে যায়! জাফর ভাই একটু দূরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করতেন। আব্বু, আমি গাড়িতে বসে গল্প করতাম। প্রথমেই আব্বু লজ্জিত স্বরে বলবে আমিতো কিছুই আনতে পারি নাই আম্মু! তাড়াহুড়ো করে আসছি।” আমিও ভদ্রতা করে উত্তর দিতাম ‘না না ঠিক আছে!”

স্কুল, কলেজে থাকতে আব্বু কখনো বাইরের খাবার খেতে দিতেন না, কিন্তু হলের সামনে এসে আব্বু আমাকে নিজেই সাধতেন ‘ ঝালমুড়ি খাবা আম্মু?” “আম ভর্তা?” “ফুচকা? ” “চটপটি? ” ইত্যাদি ইত্যাদি! আমি নবাবজাদির মতো একটার পর খেতেই থাকতাম, আর আব্বু পড়াশোনা কেমন হচ্ছে? লাইব্রেরী যাই নাকি? ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করছি কিনা খবর নিতেন। হলের বাইরে এমন কোন জিনিস থাকতো না আব্বু খাওয়াতেন না, এক্ষেত্রে জাফর ভাই আব্বুকে আরো উৎসাহিত করতেন! আমার খাওয়া শেষ হলে আব্বু আবারো জিজ্ঞেস করতেন “আর কিছু খাবে মা?”
গাড়ি থেকে নামার আগে আব্বু কোন কোন দিন আমার হাতে পাচশো অথবা এক হাজার টাকা ধরিয়ে দিতে দিতে বলতেন ‘ আমি তো কিছু আনি নাই, এটা দিয়ে ফল কিনে খাবে।’ সেই টাকা দিয়ে জীবনে কোনদিন ফল কিনে খেয়েছি বলে মনে পরেনা।
গাড়ি থেকে নেমে হলের গেট পর্যন্ত আব্বু এগিয়ে দিতেন। তারপর শুরু হতো আমাদের বার্গেনিং।
-“আব্বু, তুমি গাড়িতে যাও, আমি এখানে দাড়াই”
-“না মা, তুমি হলের ভিতরে যাও, আমি এখানে আছি”

হলে ঢোকার আগে এবার আমি আব্বুকে জড়িয়ে ধরতাম। আমার বুকটা ফাকা হয়ে যেত। আবার এই অচেনা শহরে আমি একা। ওই সময়টা আমি সবসময় মনে মনে প্রার্থনা করতাম আল্লাহ আমি আবার ছোট হতে চাই, আবার আব্বু আম্মুর সাথে একসাথে থাকতে চাই।

হলের ভিতর যাওয়া পর্যন্ত যতক্ষণ আমাকে দেখা যায় আব্বু দাড়িয়ে থাকতেন। আমি অদৃশ্য হলে তবেই আব্বু গাড়িতে উঠতেন।

আব্বুর অফিসের গাড়িতে বেশিরভাগ সময় আমার সিলেট যাওয়া হতো। আব্বু নিজেই বলতেন আমার কোলে মাথা দিয়ে ঘুমাও। প্রথম প্রথম মাথা রাখতে লজ্জা লাগতো। ৪ বছরের অধ্যবসায়ে পরে ঠিক অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ঘুমালে আব্বু খালি মাথা নেড়ে দিতেন। জাফর ভাই মাঝে মাঝে আবার সামনের গ্লাসে উকি দিয়ে দেখতেন, আর মুচকি হাসতেন। আমাদের গাড়ি মাঝখানে দশ/ পনেরো মিনিট ব্রেক নিতো। ঢাকা- সিলেট মহাসড়কে অবস্থিত রেস্টুরেন্ট ‘ উজান ভাটি’ কিংবা ‘ হাইওয়ে ইনন’ এ আমি আর আব্বু চা খেতাম। কি সুন্দর ছিল সেই জার্নি!
ডিসেম্বর মাস, অনার্স পরীক্ষা শেষ হলো! আব্বুর সাথে সিলেট যাবো! শীতের মধ্যে সকাল ৬ টায় রওনা দিয়েছিলাম। ভারী সোয়েটার পরে গুটুসুটি হয়ে পুরা রাস্তা আব্বুর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়েছিলাম। এক ঘুমে সিলেট! আব্বুর কোলে আমার শান্তির ঘুম!

তারপর একদিন। তখনো শীত কাটেনি, ফেব্রুয়ারী মাস চলে এসেছে। জাফর ভাই ফোন দিয়েছেন-

  • “আসসালামু আলাইকুম আপা। ভাল আছেন?
  • “জ্বি ভাইয়া। আপনি ভাল?”
  • ” আপা, মন্ত্রণালয়ে মিটিং এ আসছিলাম। আপনি হলে? দেখা করতে পারবেন? ৫/৭ মিনিটের মধ্যে হলের সামনে আসছি। “

-” জ্বি আসেন। আমি নিচে নামছি।”

আমি হলের বাইরে আসলে জাফর ভাই গাড়ির দরজা খুলে দিলেন বসতে। একে একে ঝালমুড়ি, আমড়া, আম ভর্তা যা যা ছিল এগিয়ে দিচ্ছেন, আর আমিও আপন মনে খেয়েই যাচ্ছি। একবারও ভদ্রতা করে বলছি না ‘ না না, ঠিক আছে!’ সাথে পড়াশোনা যেন ঠিকভাবে করি, লাইব্রেরী যাই, ঠিকমতো খাবার খাই সব বলে দিলেন। আমি দেখলাম আব্বুর এক অলৌকিক ছায়া জাফর ভাইয়ের মধ্যে! আব্বুর মত কথা বলা শিখে গেছেন।
হলের গেটে এসে ধন্যবাদ দিতে ভুললাম না। হলের দিকে যেতে যেতে আমার কানে ভেসে আসলো হলের গেটের পাশে জুতা সেলাই করা শিপনদা জাফর ভাইকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করছেন

“আজকে আপার বাবা আসেন নাই?”

শুনলাম জাফর ভাই অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলছেন “গত মাসে স্যার মারা গেছেন…”
… আর বেশি কিছু শোনার আগেই আমি তাড়াতাড়ি হলের ভিতর ঢুকে গেলাম। কারন আমি জানি, এখন থেকে আমাকে পিছন থেকে দেখার জন্য কেউ আর নেই…

– Khadiza tul kobra kabbyo

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Khadiza tul kobra kabbyo
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!