বেতনের টাকাটা কখন আব্বা আম্মার হাতে দিব এটা আমার প্রতি মাসে একটা স্বপ্নের মতো। বেতনের টাকাটা আজকেই পেয়ে গেলাম। মাসের একবারে প্রথম তারিখেই। মনের মধ্যে প্রচন্ড আনন্দ কাজ করছিলো যখন চেক দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা গুলো উঠিয়ে গুনছিলাম।
মনে মনে ভাবছিলাম “কখন বাসায় যাব?”
বেতনের টাকাটা আব্বার হাত হয়ে আম্মার হাতে তারপর বউয়ের হাতে দিবেন তারপর আবার আম্মার কাছে বউ দিয়ে দিবে। আম্মার কাছেই জমা থাকবে।তারপর সারা মাস আম্মার কাছে থেকে চেয়ে নিব যখন যা লাগে। অন্যরকম আনন্দ লাগে। আমরা পরিবারের সবাই আম্মার কাছে টাকা জমা রাখি। আমার ছোট বোন, আমার বউ, এমনকি আমার ছেলে মেয়ে দুজনও তাদের কাছে টাকা থাকলে আম্মার কাছে জমা রাখে।
এটা আমাদের পরিবারের অলিখিত একটা ঐতিহ্য। জন্মের পর থেকেই দেখে আসছি আব্বা বেতন পেয়ে পুরো টাকাটা আম্মার হাতে তুলে দিতেন। আম্মা সেই অল্প কয়টা টাকা থেকে টুক টুক করে সংসার চালাতেন। হিমশিম খেয়ে যেতেন কিন্তু চালাতেন। আব্বার কোন চিন্তা নেই। আম্মা ম্যানেজ করে ফেলতেন কিভাবে যেন। চলেও যেত সুন্দর মাসের পর মাস বছরের পর বছর।
এখনো চলে আব্বার পেনশন, দোকান ভাড়া, আমাদের আয় সব মিলিয়ে আম্মার উপর সেই দায়িত্ব এখনো বহমান। আমরা জমা দিয়েই খালাস। আমরা টাকা নেই খরচ করি। আম্মা ম্যানেজ করে নেন কিভাবে যেন??
আম্মা আমাদের ব্যাংক। সবার টাকা ভাগে ভাগে থাকে আম্মার কাছে। ৩ ভাইয়ের টাকাই থাকে। কখনো এক ভাইয়ের টাকা অন্য ভাইকে দেন না। যার যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব আছে আম্মার কাছে। বরঞ্চ আমরা টাকা বেতনের আগে শেষ হয়ে গেলেও আম্মা ঠিকই চালিয়ে নেন আমাদের ওনার কাছ থেকে দিয়ে। আমরা অবশ্য পরে শোধ করে দেই।
অনেকে ভাবছেন বউ থাকতে মায়ের হাতে কেন? দেখেন এটা একটা স্যাটিসফ্যাকশন একটা পরিপূর্ণ তৃপ্তি। না আমার বউয়ের কখনো অভিযোগ নাই বা আফসোসও নাই। আম্মা প্রতিমাসেই বেতনটা এনে দিলে বউকে হাতে দেন আর বলেন
“তোমার কাছে রাখো।”
“কি যে বলেন মা? আপনার কাছেই রাখেন আমি এতো ভেজাল নিতে পারব না।” বলেই বউ ফিরিয়ে দিবে আম্মাকে।
অনেকে হয়তো ভাবছেন আমার আব্বা কেন তাঁর মায়ের হাতে তুলে দিতেন না। তাহলে দুঃখ ভরা মনে বলতে হয়। ওনার ইনকামের বয়সের অনেক আগেই তিনি পরপারে চলে গেছেন আব্বাকে মাত্র ১২ বছর বয়সে রেখে। আর যখন চাকরী জীবনের প্রথম দিকে যখন ঢাকায় থাকতেন তখন দাদার হাতে পুরো বেতনটা দিয়ে দিতেন। পরে চট্টগ্রাম চলে যাওয়ার পর দাদা গ্রামে চলে যান তখন থেকেই আম্মার হাতে দেন পুরো মাসের একটা টাকা সহ। আমরাও পুরোটাই ধরে দিয়ে দেই একটা টাকাও নিজের পকেটে না রেখে। তারপর সারা মাস চেয়ে চেয়ে নেই।
দুপুর থেকেই টাকাটা পকেটে নিয়ে ঘুরছি। বসের সাথে অনেক গুলো মিটিং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে করে বাসায় আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। বস নামিয়ে দিলেন একটি নির্দিষ্ট দুরত্বে। আগের কিছু টাকা পকেটে থাকায় এক কেজি মিষ্টি কিনে ভাইদের ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বললাম। আজকে নতুন চাকরীর প্রথম বেতন পেয়েছি সবার সাথে একটু মিষ্টিমুখ করি।
বাড়ীতে ঢুকেই দেখলাম ছোট্টমতো একটু উঠান আছে যে আব্বা বসে আছেন চেয়ারে। সালাম দিয়ে কাছে গিয়ে সোজা পা দুটো ধরে সালাম করতে থাকলাম।
“কি রে আব্বা কি হইছে? ” আব্বা মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“আব্বা নতুন চাকরীর বেতন পাইছি। এই যে দেখেন। অনেক টাকা আব্বা” হাসতে হাসতে বলে আব্বার হাতে টাকা গুলো দিলাম।
“আলহামদুলিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ বরকত দেন” বলে আব্বা আম্মাকে ডাকতে লাগলেন।
“এদিকে আসো শুনে যাও।”
“আইতাছি দাঁড়াও। ” আম্মা ভিতর থেকে উত্তর দিলেন।
মিষ্টির প্যাকেট খুলে আমার ভাইরা আর ছেলেমেয়ে খাওয়া শুরু করেছে। একজন মেহমান ছিলেন আম্মা তার সাথে কথা বলছিলেন। তাঁকেও জোর করে মিষ্টি দেওয়া হলো। খেয়ে তিনি চলে গেলে আব্বা পাশের রুমে এসে বসলেন আবার আম্মাকে ডাকলেন, আমিও গেলাম আম্মার পিছন পিছন। আম্মা ঐ রুমে গিয়ে দাঁড়ালে পিছন থেকেই নীচু হয়ে পায়ে ধরে সালাম করলাম আর নিজে নিজে বললাম
“আল্লাহ বাঁচাক, আল্লাহ বাঁচাক “
ততক্ষণে আব্বা আম্মার হাতে টাকাটা দিয়ে দিলেন। আম্মা টাকাগুলো হাতে নিয়ে আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে দিলেন আর বলতে থাকলেন
” আম্মা অনেক দোয়া করি। তোরে আল্লাহ অনেক টাকা দেক। তোর দুইটা সন্তান বউ নিয়া অনেক সুখে থাক। তোর চাকরী চলে গেছে শুনে আমি আল্লাহর কাছে অনেক দোয়া করছি। আল্লাহ রহম করছে। তোর মালিকের লাইগাও অনেক দোয়া করি”
“থাক কাইন্দো না” আব্বা স্বান্তনা দিতে চাইলেন। আম্মা আরো ফুঁপিয়ে কান্না শুরু করলেন আমার মাথাটা বুকে চেপে ধরে।
আমি কি কান্না না করে থাকতে পারি?
পারলাম না। এতো আনন্দের মাঝে মনে হলো এ কান্নাটাই কেমন যেন সুখ লাগলো। চোখ মুছতে মুছতে আম্মাকে বললাম।
“কালকে ভাড়া নাই টাকা দিয়েন”
– Mamun Hossen
Send private message to author





