প্রেম অপ্রেম – [ পর্ব ০৩ ]

নীলাদ্রি মেহেজাবীন নীল

৩.

রিক্সায় বসেই ব্যাগ থেকে দ্রুত ফোনটা বের করে সে,
” সাবধানে যেও ।” লিখে টেক্সটটা পাঠিয়ে দেয় মেসেঞ্জারে তার কাছে । ফোনটা আবার ব্যাগে রেখে ভাবতে থাকে,
” ঐ কথাটার প্রেক্ষিতে কোন রিয়াকশন দেখতে পাইনি তার চোখে – মুখে । তাছাড়া কিছু বলেওনি । কিন্তু, কেন বলেনি? অন্য কোন ছেলে হলে তো ঐ কথাটার জন্য কোন না কোন প্রশ্ন করতো । রেগে যেত বা সম্পর্কে কোন ইস্যু দাঁড় করিয়ে চলে যেত এক মূহুর্তেই । ও তো কোন পাল্টা প্রশ্নই করেনি । কোন প্রশ্ন করেনি বা কিসের জন্য এমন হয়েছে জিগ্যেসও করেনি । কিন্তু, কেন? যদিও বাকি আট – দশটা সাধারণ ছেলের মতো ও নয় সেটা জানি । হয়তো ও বিষয়টা সম্পর্কে আগে থেকেই জানে তাই কোন প্রশ্ন করেনি বুঝতে পেরে । সে জন্যই কোন রিয়াকশনও করেনি । কারণ কথাটা বলার পর ওর দিকে চোরা চোখে তাকিয়ে দেখেছি ওকে । আগের মতোই স্বাভাবিক প্রাণচাঞ্চল্যে কথা বলেছে । নিজে এসে রিক্সা ডেকে তুলে দিয়েছে । চোখে পরার মতো তো তেমন কিছুও দেখিনি অস্বাভাবিক । তাহলে বলতেই পারি, ভুল মানুষটার হাত ধরিনি ।” কথাগুলো নিজের আপন মনে বলতে বলতে মুচকি হেঁসে ওঠে সে ।

ঢোক গিলে ইধান্ত,
” হ্যাএএএ… ” বলে মাথা উপর নিচ করে তার কথায় সম্মতি জানায় ।
এমনিতেই তার মন – মেজাজ ভালো নেই । তারপর উপর এমন উটকো কথাবার্তা শুনে তার মেজাজ আরো বিহড়ে গেছে । রাগে ফেটে পড়ার মতো ফর্সা গাল দু’টো তার লাল টমেটোর মতো হয়ে গেছে এক মূহুর্তে । চোখ – মুখ শক্ত করে,
” কি যাতা বকছিস!” বলে সে হুংকার দিয়ে ওঠে ।
হঠাৎ এমন আচমকা হুংকার শুনে ইধান্ত থ বলে গেছে । ভয়ার্ত মুখে তার দিকে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে । ঠিক বুঝে ওঠতে পারছে না কি বলবে?
” তো-র খো-দা-র মানে আল্লাহর কস-মম ফাজলামো করছি না । সত্যি বলছি ।” আমতা আমতা করে ইধান্ত আবারও বলে ।
কসম কাটা বা মুখে উচ্চারণ করাটাই সে একদম পছন্দ করে না । কিন্তু, তার সৃষ্টিকর্তার কসম কাটা শুনে সে খানিকটা হতবিহ্বলের মতো ইধান্তের দিকে তাকিয়ে থাকে । মুখের হাবভাব, ভয়ার্ত চোখ কথা বলছে ঘটনা তাহলে আসলেই সত্যি! থমথমে গলায় সে জিগ্যেস করে,
” শুভেন্দু কোথায়?”
” ডি-এস-সিসি হসপিটাল ।”
সে চিলের মতো ছুঁ মেরে ইধান্তের হাত থেকে বাইকের চাবিটা নিয়ে, দ্রুত হেঁটে এগিয়ে এসে গিয়ারে চাবি ঢুকিয়ে, বাইক স্টার্ট দেয় । তার পেছন পেছন হন্তদন্ত হয়ে ইধান্ত বাইকের পেছনে এসে বসে । বুঁওওও… বুঁওওও… রাস্তায় তুমুল শব্দের কম্পন তুলে ক্যাম্পাস থেকে হাসপাতালে দিকে এগিয়ে যেতে থাকে ওরা একসাথে ।
হাসপাতালের সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে উঠতে সে জিগ্যেস করে,
” কতো নম্বর ফ্লোর-কেবিন?”
” ছয় নম্বর ফ্লোরের ৩০৯ নম্বর কেবিন ।”
কেবিনে হুট করে ঢুকে পড়ায়, সে হতভম্ব হয়ে গেছে । কেননা শুভেন্দু আর অরুন্ধতী একে অপরকে জড়িয়ে, বেহুঁশ পাগলের মতো লাগাতার চুমু খাচ্ছে । অরুন্ধতীর গাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়েছে । কি সুন্দর! এমন জীবন্ত পবিত্র দৃশ্য সে নিজের চোখে সামনাসামনি কখনো দেখেনি এর আগে । পাথরের মূর্তির মতো সে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে । স্বর্গের সব প্রেম যেন ওদের উপর ঢলে পড়েছে । পিঠের উপর মৃদু ধাক্কা লাগতেই হু্শ ফিরে তার । পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখে ইধান্ত বত্রিশ পাট্টি দাঁত বের করে হাসছে । চোখে – মুখে খুশিও উপচে পড়ছে । তার এবার অস্তিত্ববোধ হতে থাকে । এভাবে কারো একসাথে একান্ত ব্যাক্তিগত সময় কাটানো মূহুর্ত আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে নেই । যেহেতু, ওরা অন্তত একটা রুমে আবদ্ধ অবস্থায় আছে । চলে যাবে নাকি থেকে যাবে ভাবতে ভাবতেই সে কেবিনের দরজা থেকে বাইরে বের হয়ে আসে । নির্লজ্জের মতো তখনও ইধান্ত ওদের চুমু খাওয়া দেখছে । কপালের ঘাম বৃদ্ধাঙ্গুলী দিয়ে ঝেড়ে ফেলে, করিডোরে রাখা বড় বেঞ্চটায় বসতে বসতে সে পেছন থেকে ইধান্তকে উদ্দেশ্য করে বলে,
” ইধু চলে আয়… ওদের একা ছেড়ে দে! নিজেদের মতো থাকুক কিছুক্ষণ ।”
” দেখেছিস! শ্লার হেব্বি দম আছে । অ্যাক্সিডেন্ট করেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে প্রেম করছে, আবার চুমুও খাচ্ছে!”
সে চুপ মেরে আছে দেখে ইধান্ত আবারও বলে,
” শ্লা… রুমে বসে প্রেম করে চুমু খাচ্ছিস যখন দরজাটা আটকে নিবে তো!”
” এটা হাসপাতাল, ওদের বেড রুম না যে যখন তখন দরজা আটকে রাখবে । আমারই উচিত ছিলো, দরজায় নক করে ভেতরে যাওয়া । চিন্তায় রাগে সব ভুলে গেছি ।”
” তাই, বল । অবশ্য… ভুল বলিসনি ।”
” তুই তো তারপরও নির্লজ্জের মতো দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে দেখছিলি ।”
” দেখেছি তো কি হয়েছে? তুই ও তো দেখেছিস!”
” সেটা তো রা… ভুলে যাস না ওরা এখন স্বামী-স্ত্রী । প্রেমিক-প্রেমিকা আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আকাশপাতাল তফাৎ । সবার সামনে থেকে প্রেম করা ভালোবাসা আর বদ্ধ রুমে প্রেম-ভালোবাসা দুটোই আলাদা । তাহলে, আর বদ্ধ রুমের প্রয়োজন থাকতো না ।”
” শ্লার… এটাই তো মনে থাকে না, ওদের যে বিয়ে হয়েছে!” উত্তেজিত হয়ে কথাটা বেশ খানিকটা জোরে বলেই ইধান্ত নিজের জিহ্বায় কামোড় কাটে । সে কপাল কুঁচকে চোখ রাঙিয়ে বলে,
” কি!”
” না । কিছু না ।” কথাটা এরিয়ে যাওয়ার জন্য ইধান্ত আবারও বলে,
” আমি তো কিছুই বলিনি । কিছুই জানি না ।” বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে থাকে ।
ও দিকে তার ঠোঁটের কোণে রহস্যজনক বাঁকা হাসি ঝুলতে থাকে ।
বেশকিছুক্ষণ পর অরুন্ধতী কেবিন থেকে বের হয়ে আসে । করিডোরের সামনে আসতেই,
” আরে… সৌ-দা, ইধুদা তোমরা এখানে? কখন এলে?”
ইধান্ত থানিক লাফিয়ে ওঠে,
” এই তো খুব বেশি না ঘণ্টা আধা হবে ।” দাঁড়িয়ে ঘড়ি দেখে বলে ।
” এমা… সেকি! এতোক্ষণ ধরে বাইরে এই গরমের মাঝে বসে আছো! ভেতরে যাওনি কেন?”
” তোরা প্রেম করতে থাকলে ভেতরে ঢুকবই বা কিভাবে?” লম্বা একটা হাই তুলে বলে ।
মেয়েটা এতো ফর্সা যে ওর গালের শিরা-উপশিরা পর্যন্ত দেখা যায় । মূহুর্তের মধ্যেই গাল দুটো লাল হয়ে গেছে । নিজেকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখেই বলে,
” ওহ্… আচ্ছা ।”
সে অরুন্ধতীকে জিগ্যেস করে,
” কখন এসেছো আফরিন?”
” ঘন্টা দের হবে দাদা ।”
” তা যাও না দাদা ভেতরে । ও বসেই আছে । কিন্তু, একদম কথা শুনতে চাচ্ছে না, বলে আজই বাড়ি যাবে । এই অবস্থায় বেশি নাড়াচাড়া করতে ডক্টর না করেছে । দাদা ওকে একটু বুঝিয়ে বলো ।”
” আচ্ছা, ঠিক আছে । এসব নিয়ে তুমি ভেবো না ।”
” আমি বরং যাই দাদা । দেরী হয়ে যাচ্ছে । আসি ।”
” হুম… এসো ।”
সে বলে ওঠে,
” আফরিনকে এগিয়ে দিয়ে আয় ।” ইধান্তকে উদ্দেশ্য করে ।
” না, না দাদা । আমি একাই যেতে পারবো ।”
ইধান্ত বলে,
” নিচে শুভেন্দুর গাড়ি পার্ক করা দেখলাম তো ।”
” সৌ-দা ও নিচে গাড়ি রেখেছে । আব্বাস চাচ্চু আমাকে পৌঁছে দিবেন ।”
” আচ্ছা । সাবধানে যেও ।”
হঠাৎ অরুন্ধতীর কপালের সিঁথির দিকে চোখ পরতেই সে বলে ওঠে,
” আফরিন শোন.. “
” হ্যাঁ, দাদা?”
” একবার ভেতরে এসো তো!”
” কেন, দাদা?”
” এসো… দরকার আছে ।” কথাটা বলেই সে কেবিনের ভেতর চলে আসে । তার চলে যাওয়া পথের দিকে, অরুন্ধতী ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়ে আছে । ইধান্তকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জিগ্যেস করে,
” সৌ-দার আবার কি হলো বলো তো?”

#চলবে….

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
2
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!