পরিবর্তন

প্রতিদিন সকাল ছ’টা বাজতে না বাজতেই স্নেহার বাবা সারা ঘরে পায়চারি করা শুরু করেন আর নানা ধরনের শব্দ করতে থাকেন! ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টানাটানি করা, রান্নাঘরের এটা-ওটা নাড়াচাড়া করা, একটু পর পর দরজা খুলে আজকের পত্রিকা দিয়ে গেছে কি না সেটা দেখা- অর্থাৎ সারাদিনের প্রায় সকল কাজ তাঁর সাত-সকালেই করতে হবে!
ছুটির দিনগুলোতেও তাঁর এই রুটিনের ব্যাত্যয় ঘটে না। এ নিয়ে প্রায়ই স্নেহার মায়ের সাথে স্নেহার বাবার খিটিমিটি লেগে যায়। 
স্নেহার মা কপট রাগ দেখিয়ে বলেন, “আহ্! ছুটির দিনেও কি ছেলে-মেয়ে দু’টোকে ঘুমোতে দেবে না নাকি?”
বাবা উত্তর দেন, “প্রতিটা সকালেরই আলাদা সৌন্দর্য আছে। কালকের সকাল আর আজকের সকাল এক নাকি? আমার ছেলেমেয়েগুলো সকালের এ সৌন্দর্য উপভোগ করবে না?”  

আজ শুক্রবার। প্রেজেন্টেশন, মিডটার্ম আর অ্যাসাইনমেন্টে পরিপূর্ণ ব্যস্ত একটা সপ্তাহ কাটানোর পর স্নেহা ভেবেছিল যে আজ বেলা করে উঠবে। বাবার জন্য সেটা সম্ভব হল না। স্নেহা মোবাইল অন করে দেখল ‘মাত্র’ সকাল আটটা বাজে। 
স্নেহা ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। ওর ছোট ভাই রাতুল এখনো ওঠে নি ঘুম থেকে। ফাজিলটা অঘোরে ঘুমাতে পারে। বাবা কর্তৃক সৃষ্ট উচ্চ মাত্রার শব্দ দূষণে ওর ঘুমের তেমন ব্যাঘাত ঘটে না। 

স্নেহা মুখে ফেসওয়াশ লাগালো। আজকাল এদেশের প্রোডাক্টের উপর নির্দ্বিধায় ভরসা করা যাচ্ছে না। ওদের এক ক্লাসমেট বিদেশ থেকে সরাসরি বিভিন্ন প্রোডাক্ট নিয়ে আসে। ফেসওয়াশটা ওর থেকে কেনা।
প্রতিদিন সকালে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুতে পারলে একটা সজীবতা আসে। ক্যাম্পাস খোলা থাকলে সেটা সম্ভব হয় না। আজ ছুটির দিন। আজ ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়ার মতো সময় পাওয়া যাবে। 

ফেসওয়াশ মুখে লাগিয়ে মিনিট পাঁচেকের মতো অপেক্ষা করতে হবে। এমন সময় স্নেহার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। 
ত্রপা ফোন করেছে। স্নেহা ফোন রিসিভ করতেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ত্রপা বলে উঠল, “হেই চিপকা, হোয়াট’স আপ।”  
ওদের ক্লাসের মেয়ে close friend রা একজন আরেকজনকে ‘চিপকা’ বলে ডাকে। যেমন:- স্নেহা আর ত্রপা চিপকা ফ্রেন্ড। মেঘা, বন্যা আর শ্যামলী- এই তিনজন পরস্পরের চিপকা ফ্রেন্ডস। খুশবু আর আনিকা চিপকা ফ্রেন্ড।  

ত্রপা বলতে লাগল, ” চিপকা। আজ বিকেলে বাসায় চলে আয়। তোকে তো বলেছিলাম যে তিশাপুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। আজ পাত্রপক্ষ ওকে দেখতে আসবে।”

ত্রপা, স্নেহার খুব কাছের বন্ধু। ওরা দুই বোন। তিশাপু আর ত্রপা। দুই বোনই খুব গুণী। ভালো ছাত্রী।
তিশাপু সুন্দর গান গায়। রান্নার হাত ভালো, খুব ভালো সেলাই করতে পারে। অসম্ভব সুন্দর মনের একজন মানুষ।
ত্রপাও দুর্দান্ত। ভালো আবৃত্তি করে, ক্যাম্পাসের ডিবেটিং সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ও। 

আন্টি, মানে ত্রপার মা’র শুধু একটাই দুশ্চিন্তা যে উনার দুই মেয়ের একজনও ফর্সা না। মেয়েদের বিয়ে দেয়ার সময় এটা নাকি ভোগাবে।
স্নেহার কাছে আন্টির দুশ্চিন্তা অমূলক মনে হয়। এই একবিংশ শতাব্দীর চমৎকার একটা পরিবারের অসম্ভব রুপবতী আর গুণবতী দু’টো মেয়ে সামান্য গায়ের রঙ এর জন্য বিয়ের সময় ভুগবে? এ-ও কি সম্ভব? 

মোঃ সাদিক হোসেন শিবলি নামের একজন মানুষের সাথে তিশাপুর বিয়ের কথাবার্তা চলছে। মানুষটা একটা ফিন্যান্স কোম্পানিতে ভালো চাকরি করেন।
শিবলি ভাইয়া দেখতে বেশ হ্যান্ডসাম। রুপবতী তিশাপুর সাথে ভাইয়াকে মানাবে ভালো।
স্নেহা নিশ্চিত, এখানে মেঘা আর শ্যামলী থাকলে ওরা খুব দ্রুতই শিবলি ভাইয়ার উপর ক্রাশ খেয়ে যেত। মেয়ে দু’টো হুটহাট ক্রাশ খেতে পারে। 
আর মেঘা তো পুরো ব্যাপারটাকে অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ যৌনতার দিকে নিয়ে যেত! এসব মনে করে স্নেহার হাসি পাচ্ছে।

হবু বরপক্ষের হয়ে ছেলের বাবা-মা সহ জনাদশেক মানুষ এসেছে। তারমধ্যে ২৪-২৫ বছরের একটা ছেলে আছে। শিবলি ভাইয়ার কাজিন-টাজিন হবে বোধহয়।  
ছেলেটা একটু পর পর লুকিয়ে বাঁকা চোখে স্নেহার মুখ আর বুকের দিকে তাকাচ্ছে। 

স্নেহা ওদের ক্যাম্পাসের অন্যতম সেরা রুপবতী। প্রতিদিন না হলেও, প্রতি এক-দুই সপ্তাহ পর পরই ওদের ক্যাম্পাসের ’ক্রাশেস অ্যান্ড কনফেশন’ পেইজে ওকে নিয়ে কনফেশন আসে। 
আজ ও একটা কচি কলাপাতা রঙ এর সালোয়ার-কামিজ পরে এসেছে। ও সবসময় একটু বড় সাইজের ওড়না পরতেই পছন্দ করে।  
স্নেহা ওর ওড়নাটা একটু ঠিক করে নিল। ছেলেটার চোরের মতো তাকানোর ব্যাপারটায় ওর অস্বস্তি হচ্ছে। ওর ইচ্ছে করছে ছেলেটাকে ডেকে কড়া ভাষায় বলতে, “ভাইয়া শোনেন, এইভাবে লুকায় লুকায় আমাকে দেখা বন্ধ করেন। আমার ডিসগাস্টিং লাগছে।” 

সাধারণত পাত্রী দেখতে গেলে যেসব রুটিন কথাবার্তা হয়, দুই পরিবারের মধ্যে সেসব কথা চলতে লাগলো।

শিবলি ভাইয়ার মায়ের ইঙ্গিত পেয়ে শিবলি ভাইয়ার কোনও এক মামী অথবা খালা হঠাৎ বলে উঠলেন, “সবই তো বুঝলাম। কিন্তু কথা হইল গিয়া, মেয়ের গায়ের রংটা একটু ময়লা। আমাদের রাজপুত্রের মতো ফর্সা ছেলের পাশে এই জায়গায় একটু কম মানাবে।”
খানিক বাদে তিনি নিজেই এই ‘সমস্যা’র সমাধান করে দিলেন, “আজকাল তো অনেক কিরিম (ক্রিম) বাইর হইছে। ওইগুলান মাখলেই গায়ের রঙ ঠিক হয়ে যাবে।” 

মহিলাটি যা বললেন তা প্রচণ্ড কুরুচিপূর্ণ এবং অপমানজনক। তার চিন্তাভাবনা ও মন-মানসিকতার দৈন্য একেবারে নগ্ন হয়ে পড়ল। এতোগুলো মানুষের মাঝখানে এ ধরনের কথার একটা কড়া জবাব দেয়া উচিত।  
কিন্তু কে দেবে জবাব? ত্রপার বাবা-মা বড্ড ভালো মানুষ। উনাদের পক্ষে এতোগুলো মানুষের সামনে কোনও কড়া কথা বলা সম্ভব না। 

জবাবটা ঠিক যেখান থেকে আসা উচিত ছিল, সেখান থেকেই এল। ক্যাম্পাসের ডিবেটিং সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি ত্রপা বলে উঠল, ” ছিঃ আন্টি। কী বললেন আপনি? গায়ের রঙ আজকাল কোনও বিবেচ্য বিষয়? আপনি টিভি দেখেন না? পেপার পড়েন না? ‘রেসিজম’ নিয়ে সারাবিশ্বে কী তুলকালাম ঘটে যাচ্ছে। এতো ব্যাকডেটেড হলে হবে?” 
ত্রপা হয়তো আরও কিছু বলতো। কিন্তু শিবলি ভাইয়া আর তার বাবা ঐ মহিলার বক্তব্যের জন্য স্যরি-টরি বলে কথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল।   

ত্রপা ওর রুমে চলে গেল। স্নেহাও গেল পিছু পিছু। ত্রপা ভয়ানক রেগে গেছে।
ও বলছে, “আরে, স্কিনে মেলানিন বেশি থাকলে সে হয় কালো, কম থাকলে হয় ফর্সা।
সামান্য একটা পদার্থ কম-বেশি থাকা নিয়ে এতো কথা! হোয়াট এ শেম।” 
সেদিনের মতো শিবলি ভাইয়ারা বিদায় নিল। এ সম্বন্ধ আর আগাবে কি না সেটা তাঁরা পরে জানাবে বলল।  

স্নেহা অনেকদিন ধরেই ভাবছে, একটা জুতোর বাক্স একটু কেটেকুটে বারান্দার গ্রিলের সাথে টাঙ্গিয়ে দেবে। ওটাতে চড়ুই পাখিরা এসে বাসা বাঁধবে। ইট-পাথরের রুক্ষ এই শহরে দু’চারটে চড়ুই পাখির একটা আশ্রয় জুটবে।  
মায়ের জন্য ওর এই উদ্যোগ সহজে সফল করা যাবে না। ‘বারান্দা নোংরা হবে’- এই অজুহাতে মা তাকে কাজটা করতে দেবে না। কিন্তু স্নেহা কাজটা করবেই করবে। আজ হোক-কাল হোক, চড়ুই পাখিদের একটা আশ্রয় সে গড়ে তুলবেই। 

হঠাৎ ত্রপা ফোন দিয়ে বলল, “হেই চিপকা, হোয়াট’স আপ।
দ্রুত বাসায় আয়। তোর সাথে অনেক ইম্পর্ট্যান্ট একটা বিষয় নিয়ে কথা আছে।”  

ত্রপা একটা টি-শার্ট আর স্কার্ট পরে ওর ঘরের বিছানায় বসে আছে। স্নেহা ওর পাশে গিয়ে বসল। 
স্নেহা জিজ্ঞাসা করল,” বল তোর ইম্পর্ট্যান্ট কথা। তিশাপুর বিয়ের ডেট ফাইনাল?” 
ত্রপা বলল, “না রে, শিবলি ভাইরা এখনো কিছু জানায় নি।
ইম্পর্ট্যান্ট বিষয়টা আমার। তুই ক্যাম্পাসের আসিফকে চিনিস?” 
” হ্যাঁ। ও আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। ভালো ছেলে। কী হয়েছে ওর?”  
ত্রপা একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, “ও কাল রাতে মেসেঞ্জারে আমাকে প্রপোজ করেছে।”
স্নেহা প্রচণ্ড খুশি হয়ে বলল, “ওয়াও। ও তো চমৎকার ছেলে। ভালো ছাত্র। গিটার বাজিয়ে গান গায়। দেখে তো ওরকম লুইচ্চাও মনে হয় না। ফেসবুকে দেখে তো মনে হয়, ফ্যামিলিও বেশ ভালো।”  
ত্রপা বলল, “হুম। আমি খোঁজখবর নিয়েছি। ছেলে ভালো বলেই তো আমাকে প্রপোজ করা অব্দি আসতে পেরেছে। নইলে তো আমি ‘নিপড ইন দ্য বাড’ করে দিতাম। 
কিন্তু একটাই সমস্যা দোস্ত। ছেলেটা খাটো।”
ত্রপার কথা শুনে স্নেহা একটু অবাক হল। ও বলল,”মানে?”
” মানে হল, আমার মনে হয়, ছেলে মানুষ মানেই লম্বা। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন, আমার লাইফ পার্টনারের হাইট ছয় ফিটের কাছাকাছি হবে। আসিফের হাইট হবে সাড়ে পাঁচ ফিটের মতো।”  

ত্রপার এই অদ্ভুত স্বপ্নের কথা শুনে স্নেহা অবাক হল। ও বলল, ” দ্যাখ, গায়ের রঙ, হাইট, জিম করা ফিগার, জিরো ফিগার- এ সবই মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য বা হার্ড স্কিল। 
আমি মনে করি, এগুলোর কোনোটাই একজন মানুষকে বিচার করার মাপকাঠি হতে পারে না। ‘পরিবর্তন’ যদি আমরা আনতে চাই তবে পুরোপুরি পরিবর্তন আনতে হবে।
অর্ধেক-অর্ধেক পরিবর্তন আদতে কোনও পরিবর্তনই আনতে পারবে না।”   

স্নেহার কথাগুলো শুনে ত্রপা কিছুক্ষণ চুপ করে কী যেন ভাবলো। তারপর ও বলল, ” তুই ঠিকই বলেছিস চিপকা। তুই আমার চোখ খুলে দিয়েছিস। আমি আজই ‘আসিফ’ নামের পাগলটার প্রপোজাল অ্যাকসেপ্ট করব।”  

হঠাৎ তিশাপু রুমে ঢুকে বললেন, ” তোদের জন্য একটা সুসংবাদ আছে। তার আগে স্নেহা, তুমি কিন্তু আজ খেয়ে যাবে।
আজ আম্মু না, আমি রান্না করেছি। ফ্রায়েড রাইস, ভেজিটেবল। চিকেনের একটা আইটেম রেঁধেছি। স্মোকি ফ্লেভার আনার চেষ্টা করেছি। কতোটুকু আনতে পেরেছি- সেটা তুমি খেয়ে বলবে।”
চাইনিজ আইটেমগুলো তিশাপু অসাধারণ রাঁধে। তারপরও ত্রপা উনাকে রাগানোর জন্য বলল, “তুই রেঁধেছিস আপি? ও জিনিস মুখেও দেয়া যাবে না। আর মুখে দিলেও ডায়রিয়া হবে।”   
তিশাপু মুখ উল্টিয়ে বলল, ” তোকে কে খেতে বলল? আজ দুপুরে তোর উপোস। মজার মজার খাবারগুলো স্নেহা খাবে, আমরা খাবো। তুই শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবি।   
এখন সুসংবাদটা শোন। তোদের শিবলি ভাইয়া ফোন করেছিল। ওর মামীর সেদিনের ঐ কথার জন্য ওরা খুব লজ্জিত। খুব শীঘ্রই ওরা বিয়ের ডেট ফাইনাল করে ফেলবে।  
গায়ে হলুদের প্রোগ্রামের দায়িত্ব কিন্তু তোদের। ইউনিক একটা হলুদ চাই আমি।”
ত্রপা উঠে গিয়ে তিশাপুকে জড়িয়ে ধরল। ওদের দেখে কে বলবে, একটু আগে ত্রপা, তিশাপুর রান্না নিয়ে তিশাপুকে পঁচাচ্ছিল।
তিশাপু চলে যাওয়ার পর ত্রপা রুমের দরজা আটকে দিল। ওরা দু’জন এখন গায়ে হলুদের অনুুুষ্ঠানের পরিকল্পনা করবে।

একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক চিন্তাধারার দু’জন মানুষের পরিকল্পনা যে অসাধারণ হবে, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই।

– Munif Muhtasim

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
4
0
1
0
0
1
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Munif Muhtasim
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!