পুনশ্চ

এসির টেম্পারেচার ২০ ডিগ্রীতে আছে। কিন্তু মাহবুব সাহেবের কাছে সেটা শূন্য ডিগ্রী বলে মনে হচ্ছে। এমনিতেই বাইরে ভারী বর্ষণ। পুরু কাচের ঠিক ভেতরে বসে থাকতে থাকতে আবিরের স্মৃতি ভেসে উঠছে। বৃষ্টি হলেই ছেলেটা রাস্তায় নেমে যেত। কারোর বারণ শুনতো না।

প্রায় কাকভেজা অবস্থায় রেস্টুরেন্টে ভদ্রলোক ঢুকলেন। সাথে সাথে রেস্টুরেন্টে বসে থাকা ২০-২৫ জোড়া চোখ তার দিখে ঘুরে গেলো। ঘুরবেনা কেন! গায়ে উকিলের কালো পোশাক, লম্বাটে মুখে দৃঢ় প্রত্যয়ের অভিব্যক্তি। তবে তারচেয়ে বড় আকর্ষন, ক্রাচে ভর দিয়ে হাটার ব্যাপারটা। ইতি উতি করে মাহবুব সাহেবকে দেখতে পেয়েই মুখে হাসি ফুটলো।

-সরি, একটু লেট হয়ে গেলো!

“না, না, ঠিক আছে, আপনিই অযথা কষ্ট করলেন। ব্যস্ত মানুষ আপনি।আমিই বরং আপনার চেম্বারে গিয়েই দেখা করে আসতাম” কাশতে কাশতে বললেন মাহবুব সাহেব,”আপনি কেসটা লড়ার জন্য রাজি হয়েছেন, এই আমার সৌভাগ্য “

বলতে না বলতেই হুট করে কেদে ফেললেন মাহবুব সাহেব। কাচের বাইরে তাকিয়ে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো হামজা। এরকম দৃশ্য তার কাছে খুব স্বাভাবিক। কাদলে নাকি মন হাল্কা হয়। তাই খানিকক্ষন কাদতে দিলো। এর ফাকে ওয়েটার কে ডেকে দু কাপ কফি চেয়ে নিলো। খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিতে দিতে বললো,”আবিরের খুনিকে শাস্তি দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো আমি মাহবুব সাহেব।আপনি শুধু ছেলেটার জন্য দোয়া করুন।”

টেবিল থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুছলেন মাহবুব সাহেব।”অনেক আশা নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। আমার ছেলে অসতকর্তায় মারা যায় নি। ফুটপাথের উপর বাস উঠিয়ে দিয়েছে,আমার ছেলের গায়ের উপর। কেস করেছি তাই সরকারী দলের লোকেরা চাপ দিচ্ছে। কোন মন্ত্রীর ভাগ্নের বাস। কেস উইথড্র করে নিতে বলছে” দীর্ঘশ্বাস চাপলেন মাহবুব সাহেব।

“নাহ, কেস উইথড্র করবেন না, আমি লড়বো। পরশু কেসটার শুনানী। আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।” যান্ত্রিক ভাবে বললো হামজা। “আর টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করবেন না। আর এসব কেসে আমি টাকা নিই না ” কফিটা শেষ করতে করতে বললো হামজা

“আপনি টাকা নেবেন না?.কেন?”ভাবলেশহীন চোখে প্রশ্ন করলেন মাহবুব সাহেব।

হাসল হামজা ,”২০১৮ সালে, আমার দুটো বন্ধু বেপরোয়া ড্রাইভিং এ মারা যায়। আমরা আন্দোলন করেছিলাম, নিরাপদ সড়কের জন্য। অনেক মার ও খেয়েছিলাম। এই যে অচল পা টা দেখছেন, এটা সন্ত্রাসীদের নির্মমতার চিহ্ন। এই পা টা সাক্ষী, আমি আমার বন্ধুদের জন্য সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেও দাবি আদায় করতে পারিনি।তাই কোন ধরনের এক্সিডেন্ট বা হিট এন্ড রান কেস লড়তে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে টাকা নিই না। কেস জিতলে মনে হয়, যেন তাদের আত্মার সাথে সাথে আমার ভিতরটাও শান্ত হয়”

চোখ মুছল হামজা।”আচ্ছা, আজ আসি, পরশু কোর্টে দেখা হবে।” বলে ক্রাচটা বগলে বাধিয়ে চলে গেল। বৃষ্টিটা থেমেই গেছে বলা চলে। ভেজা কাচের ভেতর দিয়ে যতদূর যায় হামজার গমনপথের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন মাহবুব সাহেব।

ধূমায়িত কফি ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। ছেলেটাকে কেন যেন খুব চেনা মনে হচ্ছে মাহবুব সাহেবের। কিছু টাকার লোভে সেই ইতিহাস গড়া ছাত্র আন্দোলন ভন্ডুল করতে তিনি হেলমেট পড়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। সেদিনই হকিস্টিক দিয়ে মারতে মারতে এক স্কুল ছাত্রের পা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। ভুলেই গিয়েছিলেন, আজ হঠাৎ করে মনে পড়ছে।

কফিটা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। চুমুক দিয়ে বিস্বাদ লাগলো। মাহবুব সাহেবের এখন আরো ঠান্ডা লাগছে, ভেতরটা যেন হুট করে অনুশোচনায় অবশ হয়ে আসছে।

ছেলেটার চেহারা আবছা মনে পড়ছে, পুরোনো সেই চেহারার সাথে হামজার চেহারা অনেকখানি মিলে যাচ্ছে…

-মুহ্তাসিম বাশির কৌশিক

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
1
0
0
0
0
1
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Muhtasim
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
রায়হানা পারভীন
Guest
রায়হানা পারভীন
4 years ago

ছোটগল্প হলেও প্রতিটি জিনিস এত ইন ডিটেলস বর্ণনা করার জন্য লেখককে ধন্যবাদ। গল্পের শেষের এই আনপ্রিডেকটেবল টার্ন লেখককে আসলেই বিশেষায়িত করে।
শুভ কামনা থাকলো।

1
Nadim Satej
Member
4 years ago

গল্পটা ছোট্ট কিন্তু এর অসাধারণ লিখনশৈলী পাঠককে সমাপ্তি অবধি জুড়ে রাখে। গল্পটা খুবই মর্মান্তিক,সমাপ্তির টুইস্ট মনকে মোচড় দেয়।
লেখনীতে আরো পরিপূর্ণ হয়ে উঠুন সেই প্রত্যাশা রাখছি। শুভকামনা রইলো💓

purba anindita khan
Member
4 years ago

দারুন লাগলো পড়ে, লেখককে অভিনন্দন!

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!