সারপ্রাইজ

রিয়াজ মোরশেদ সায়েম

গলির মুখে হঠাৎই ফারাবীর সাথে দেখা হয়ে গেল। একটুও চমকায়নি সিলভিয়া। যদিও বিষন্ন মনে হঠাৎ আশার আলো জেগে উঠেছে।

আরে ফারাবী না। কি করছো এখানে? অনেকদিনপর এ গলিতে!
কেমন আছো? অনেকগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল ফারাবীকে লক্ষ্য করে।

ফারাবীও ঠিক চিনতে পারলো তাকে।

ভালো আছি, নতুন টিউশনি করাতে এসেছিলাম। গত এক মাস ধরে আসছি।

কিন্তু ফারাবীর চোখেমুখে আনন্দের ঝলকানি নেই। বিষাদের একটা আবছা ছায়া যেন গ্রাস করে আছে তার মন। তার চোখের কোণেও কালি জমেছে। এরকম কালি তার আগেও জমেছিল। যখন তার জন্য রাতভর কান্না করেছিল। কোন কারণে মায়ের ভয়ে সিলভিয়া মোবাইল বন্ধ রেখেছিল। আর এতে ফারাবী কি না কি ভেবে রাতভর দুশ্চিন্তা আর কান্নায় সকালে চোখের কোণায় কালি জমিয়েছিল।

কি ভাবছো?
নাহ, কিছু না। ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসল সিলভিয়া।
তো, তুমি কোথায় যাচ্ছ? ফারাবী জানতে চাইল।
কলেজে যাচ্ছি।
আমিও যাব সেদিকে। চল, একসাথে যাওয়া যাক।

তারপর একপ্রস্থ নিরবতা। মন্থর গতিতে হাঁটতে লাগলো ওরা দুজন রাস্তার পাশ ঘেঁষে। বর্ষার সময়। খুব ভোরে একটানা বৃষ্টি হয়েছিল। এখনো ফুটপাতের ধারে জেগে ওঠা লতায় পাতায় জমে আছে বিন্দু বিন্দু জল। ভেজা পাতা আর জলের ফোঁটায় হালকা রোদের আলো এসে প্রতিফলিত হচ্ছে চারপাশে। হঠাৎ আকাশ আবার মেঘাচ্ছন্ন হয়ে গেল। যেন এখনই বৃষ্টি নামবে। চারদিকে বিষাদের ঘনঘটা যেন ছড়িয়ে পড়েছে। কেয়ারীর বিপরীতে দাবা রেস্টুরেন্টে বসতে চাইলো ফারাবী। সে অমত করলো না। দুজনে বশে ঠান্ডায় কফি খেতে চাইলো। কফি অর্ডার করলো।

টেবিলে কফি রাখতে রাখতে বয় ছেলেটি হেসে বললো— অনেকদিন পর আপনারা, ভাইয়া! ভালো আছেন, ভাইয়া? তার চোখেমুখে বিস্ময় দেখতে পেল সিলভিয়া। বিস্মিত হওয়ারই কথা। তিন বছর পর ওরা একসাথে এই রেস্টুরেন্ট আবার আসলো।

হুঁ বলে মাথা নেড়ে সায় দিল ফারাবী।

আর সে মুহুর্তেই অনেক স্মৃতি মনে পড়ে গেল এই দাবা রেস্টুরেন্টকে ঘিরে সিলভিয়ার। এমনি একদিন দুজন মুখোমুখি হয়ে বসেছিল ওরা। সিলভিয়া আর ফারাবী। হঠাৎ ফারাবীর কিছু ছাত্র-ছাত্রী এসে হাজির। চকবাজারে কোচিং করাতো ফারাবী। সে সূত্রে রাস্তাঘাটে তার ছাত্রছাত্রীদের ভীড়। সেদিন ফারাবী ভীষণ লজ্জা পেয়েছিল। ফারাবীর ছাত্রছাত্রীরা নাকি সেদিনটা নিয়ে অনেক বেশি মজা করতো।

কি চুপ করে আছো কেন? কি ভাবছো? ফারাবীর কন্ঠে অতীতের রোমান্টিকতায় নিমজ্জিত সিলভিয়া আবার চোখের নিচে কালি পড়া ফারাবীর চেহারায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো।

আচ্ছা তোমার মা-বাবা কেমন আছেন?
ফারাবী হাসলো। অট্টহাসি দেওয়ার মত করে একটা শব্দ করলো। হুহু করে কেঁদে দিল আবার! সিলভিয়া তার হাত ধরে চাপ দিতে চাইলেও আবার অজানা আশংকায় হাত সরিয়ে নিল। পকেট থেকে টিস্যু নিয়ে চোখ মুছলো। তারপর উপরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল বাবা মারা গেছেন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে আর মা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। টিউশনির টাকাটা আজও দিল না। এদিকে বাড়িতে টাকা পাঠানো দরকার। না খেয়ে বসে আছে ভাই-বোনেরা। অনর্গল নিজের অভাবের কথাগুলো বলতে লাগলো ফারাবী।

স্কুল জীবনের শেষদিকে প্রেমে পড়েছিল ফারাবীর সাথে। ভীষণ পাগল ছিল সিলভিয়ার জন্য। গ্রামের সহজ সরল ছেলে ফারাবী। লম্বা, ছিপছিপে গঠন। ফর্সা, মায়াবী। ভ্রু গুলো সজ্জিত করা, গাঢ় কালো। চাপ দাড়ি। হাসলে আরও বেশি লাবণ্যময় মনে হতো। বদভ্যাস শুধু ছাত্র রাজনীতি করতো। কতবার বারণ করেছে সিলভিয়া কিন্তু গোপনে ফারাবী রাজনীতিতে লেগে ছিল। সে কারণে ওদের বিচ্ছেদ হয়েছিল আজ থেকে তিন বছর আগে। প্রচন্ড ভালোবাসতো সিলভিয়াকে। ফারাবী কিন্তু সবসময় পরিচ্ছন্ন রাজনীতি পছন্দ করতো। সিলভিয়াকে সেসব বলতো। ফারাবী রাজনীতি নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। এদেশ একদিন তরুণরাই নেতৃত্ব দিবে, অন্য দলের প্রতি কোন বিদ্বেষ থাকবে না, ফারাবী এসব দূর করে দিবে। নতুন ধারার রাজনীতি আনতে চায় ফারাবী আরও কতো কিছু। এসব কারণে ফারাবী দলে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিল। প্রতিবাদের নামে হরতাল-অবরোধ সমর্থন করতো না। মিছিলেও নারাজ ছিল। একপ্রকার বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতির প্রবর্তন করতে চাইতো ফারাবী। শুধু বিরোধীদল হওয়ায় সমস্যা। সিলভিয়ার সবসময় ভয় লেগে থাকতো। জেল-জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, কথিত বন্দুকযুদ্ধ এসবের জন্য ভয় করতো খুব বেশি। এসব সইতে পারতো বলে ফারাবীকে রাজনীতি ছাড়তে বলে। কিন্তু ফারাবী রাজনীতি বেছে নেয়। বিচ্ছেদের দিন কি কান্নায় না করেছিল! কিন্তু সিলভিয়ার জেদের বশে তিনবছরের তিলে তিলে গড়া সম্পর্ক শেষ হয়ে গিয়েছিল। আজও আবেগী রয়ে গেছে ফারাবী। চোখ জুড়ে তার উৎসুকতা ছেয়ে ফেলেছে চিন্তাগ্রস্ত চেহারা।

সিলভিয়ার মন চাইছিল ফারাবীর নতুন প্রেমিকার কথা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু এতোসব দুর্দশার মধ্যে ভেতরের বোধ সায় দিয়ে উঠলো না। শুনেছিল সিলভিয়ার সাথে সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর নতুন আরেকটি মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছিল।
কিন্তু তার আগেই ফারাবী জানতে চাইলো— তোমার প্রেমিক কেমন আছে?
নাহ, আর সম্পর্কে জড়াইনি। তুমি?
আমিও না, ফারাবী বললো।
তাহলে কি আমি মিথ্যে শুনেছিলাম?
হুম বলে আবারও বিষণ্ন ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে সায় দিল।
আজ তাহলে উঠি। মেসের বাজার করতে হবে সকাল সকাল। বৃষ্টিও এসে পড়বে। এ বলে ফারাবী প্রতিবারের মতো বিল মিটিয়ে চলে গেল। সিলভিয়া তাকিয়ে থাকলো। দূরের আকাশের দিকে যেভাবে তাকিয়ে থাকে মানুষ!

বাসায় বসে জানালা খুলে সিলভিয়া দেখছে ঝলমলে আকাশ। কিছুক্ষণ পূর্বে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পর নেমেছে রোদের প্লাবন। বর্ষার শেষ দিক। ব্যালকনিতে জবা ফুলের গাছে ফুটেছে একটি সাদা জবা। সবুজ পাতারা মায়াবি আদর দিয়ে ঘিরে রেখেছে সদ্য ফোটা ফুলটিকে। কেউ যেন ছিঁড়তে না পারে এ কারণেই কি সবুজ প্রকৃতি এভাবে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে ফুলটিকে?
সিলভিয়া মনস্থির করে ফেললো আবার ফারাবীর জীবনে যাবে। যেভাবেই হোক দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবে। মরমিবাদের দেয়াল ঠেলে বুকের ভেতর আবেগে ঘূর্ণনরত বুকের ব্যাথাকে এবার থামিয়ে দিবে। ফারাবীর রাজনীতির সম্পৃক্ততা আর বড় করে তুলবে না। বারবার ফারাবীর অসহায়ত্বের চেহারা মনে পড়তে লাগলো। টিউশনির টাকা না পাওয়ায় ফারাবী বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারছে না! অথচ আগে টিউশনের টাকা পেলেই সিলভিয়াকে নিয়ে যেত ফুলের দোকানে। ফুলের মালা কিনে দিত। একজোড়া রেশমি চুড়ি। একজোড়া পায়ের নুপুর। ফারাবীর প্রথম টিউশনির টাকা দিয়ে সে সিলভিয়াকে একটি ঘড়ির ঘন্টা কিনে দিয়েছিল আজও মনে পড়ে। যেটি একটা নির্দিষ্ট সময়ে বেজে উঠতো। ফারাবী বলতো এটা যতদিন বাজবে ততোদিন আমারা একে অপরকে ভুলবো না! কতোটা সরল ছিল ফারাবী। যেভাবেই হোক কালকে ফারাবীর হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিবে বাড়িতে পাঠানোর জন্য আর তাকে আবার আপন করে নিবে। কাল ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ভালোবাসা দিবস। আর সামান্য একটু হেল্প করে এ দিবসে ভালোবাসা চেয়ে নিবে সে। যদিও সিলভিয়ার বাবা-মা শুধু শহরের স্থানীয় ছেলেকে প্রাধান্য দেয়, তারপরও সিলভিয়া আর এসবের তোয়াক্কা করবে না। দরকার হলে সে ফারাবীকে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনের দিকে পা বাড়াবে।

পরের দিন সকাল। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। হকার এসে পত্রিকা দিয়ে গেল। সিলভিয়ার বাবা তাকে পত্রিকা পড়ার অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছে। না হয় আজকালকার ছেলেমেয়েরা ইন্টারনেটেই দুনিয়া এক করে, সেখানে পত্রিকায় ওদের মূল্যবান সময় দেওয়ার সময় কয়? সকালে পূর্বদেশ পত্রিকা খুললো সিলভিয়া। এরপর যা দেখলো তাতে শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের মতো নীরব শীতে জমে গেল তার চোখ। গভীর অন্ধকার থেকে বিষণ্ণ আকাশ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো আর্তস্বরে কান্না। অন্তহীন কষ্টের পাহাড় সমান চাপ বোধ করল সিলভিয়া। মনে হল অশ্রুর বদলে নেমে আসছে যেন রক্তধারা। কিন্তু চোখে তার অশ্রু নেই। স্তব্ধ শরীরের নিথর অণুর ভেতর থেকে ক্ষুব্ধ কোনো শব্দ বেরোল না। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের তলে চাপা পড়ে গেল ক্ষুব্ধ শব্দমালা। হাতে ধরা পত্রিকায় হিমহিম অনুভব চুঁইয়ে নিভতে লাগল বুকের গহিনের লালিত স্বপ্ন! আকাঙ্খার গোপন শিখা দপ করে নিভে গেল। প্রথম পাতায় ফারাবীর লাশের ছবি আর বড় অক্ষরে হেডলাইন দেওয়া— “পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে বিরোধীদলের ছাত্রনেতা ফারাবী হোসেন সুমন নিহত!”
সিলভিয়া আরও দেখতে পেল- একটি অসুস্থ দেশে একজন ছাত্রনেতার অপমৃত্যু! একটি অসুস্থ রাজনীতি।

– Riaz Murshed Sayem

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
2
0
0
1
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Riaz Murshed Sayem
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!