ইদের শপিং শেষ করে বাড়ি ফিরলাম। আমার ছেলে মেয়েরা নতুন পোশাক দেখে খুব খুশি। একটা করে জামা প্যাকেট থেকে বের করছে, পরছে, আবার খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিচ্ছে বিছানায়। আমাদের গৃহ পরিচারিকা সেতারা খালা খুব আনন্দ নিয়ে এই দৃশ্য দেখছে। আবার যত্ন করে জামা গুলো প্যাকেটে ভরে রাখছে।
আমাদের কাছে ইদের জামা মানে অন্যরকম আনন্দের একটা বিষয় ছিল। নতুন জামা কিনে এনে সেটা লুকিয়ে রাখাটা অভ্যাস ছিল। কেউ দেখে নিলে ইদ চলে যাবে এটা ভাবতাম। ইদের আগের রাতে নতুন জামা কাপড়, জুতা সবকিছু বিছানার একপাশে নিয়ে ঘুমাতাম। যখন থেকে দেখলাম এই অনুভূতি গুলো আর কাজ করছে না তখন থেকে বুঝলাম বড়ো হয়ে গেছি। আমার ছেলে মেয়েদের মাঝে এই বিষয়গুলো কাজ করে না। ওদের কাছে ইদের নতুন জামা মানে কেবলই জামা৷ অন্যকিছু ওদের স্পর্শ করে না।
সেতারা খালা আমাদের বাসায় দুই বছর ধরে কাজ করছেন। মাঝবয়েসী এই মানুষটাকে আমার ভালো লাগে৷ সবসময় হাসিখুশি থাকেন। মন খারাপ করতে দেখিনি কখনও। রোজার মাসটা একটু বাড়তিই কাজ করে যাচ্ছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের বাসাতেই থাকেন। কাজ না থাকলেই উনার সাথে আমার গল্প করে বেশ সময় কাটে৷
“সেতারা খালা, আপনাদের ইদের গল্প শুনান তো। আপনারা নতুন জামা কেনার পরের গল্পটা বলেন।”
” গরিব মানুষ আমরা, নতুন জামা কিনে দেওয়ার সামর্থ্য বাপের ছিল না। অনেকগুলা ভাইবোন ছিলাম। তবুও ইদের আগের রাতে বাবা কই থেকে যেন নতুন জামা নিয়ে আসতো। শহরের মানুষেরা ভালো মানুষ হয়ে থাকে। যাকাতের কাপড় দেয়। লাইন ধরে বাবা সেই কাপড় নিয়ে আসতো। অনেকে তাদের ব্যবহৃত কাপড়গুলো দান করতো। আমরা ওসব দিয়েই ইদ করতাম। ঐ জামাগুলোর গন্ধ নিতাম।”
” এখন নিজের জন্য কিছু কিনেন না?”
” এখন কি আর পিচ্চি আছি? এখন ইদে একটা কাপড় হলেই হইলো। নতুন কাপড় না পরলেও তো ইদ হয়। মেয়ে দুইটার জন্য নতুন কাপড় কিনে দিলেই নিজের জন্য কেনা হয়ে যায়।”
আমি সেতারা খালাকে দেখলাম। বাড়তি একটু সুবিধার জন্য এই রোজাতেও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের কাজ করছেন। রোজা রেখে কাজ করতে আমার যেমন কষ্ট হয় উনারও তো তেমনি কষ্ট হয়। বাড়িতে তার মেয়েরাও রোজা রাখে৷ রোজা রেখে বাড়ির সব কাজ করতে ওদেরও কষ্ট হয়। সেতারা খালা গরমে কাজ করতে করতে কখনো কখনো হাঁপিয়ে উঠেন। আমি তখন নিজের ঘরে আরাম করে ফ্যান চালিয়ে শুয়ে থাকি। আরাম করাটাই হয়তো আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।
আমাদের চারজনের সংসারে খুব বেশি তো কাজ থাকে না৷ এইটুকু আমিই করতে পারি। সিদ্ধান্ত পালটালাম। সেতারা খালাকে রোজার মাসে আর কাজ করতে হবে না বলে ছুটি দিয়ে দেবো।
” খালা, এখানে আপনার বেতন আর ইদের বোনাস আছে আপনাকে এখন আর আসতে হবে না।”
” আসতে হবে না মানে কী? আমারে কি বিদায় দিয়া দিচ্ছেন? আমি কি ঠিকঠাক কাজ করি না?”
” আমি বলতে চাচ্ছি যে, আপনি এখন মানে রোজার এই কিছুদিন কাজে না আসলেও চলবে। ইদের পর আবার আসবেন। এই কিছুদিনের কাজ আমি নিজেই করে নিতে পারব। যদি দরকার হয় আপনাকে আমি খবর দেবো।”
বেশ আনন্দিত হয়েই সেতারা খালা সেদিন চলে গেলেন।
ইদের দিন।
সকাল এগারোটা বাজে। আমার ছেলেমেয়েরা এখনও ঘুমাচ্ছে। ইদের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে গোসল করে নতুন জামা পরে সবাইকে সালাম করে সালামি নেওয়ার মজাটা ওরা বুঝবে না, জানেও না এসব। আমার স্বামী সকালে নামাজ পড়ে এসে খাওয়াদাওয়া করে এখন টিভি দেখছে। আমি হয়তো হাতের কাজটুকু শেষ করে টিভি দেখব না-হয় ঘুমাব। আমাদের ইদ আর আগের মতো নেই। এখন অনলাইনেই সবাই ব্যস্ত থাকি ইদের শুভেচ্ছা জানাতে। এত সহজেই শুভেচ্ছা পাঠানো গেলে সামনাসামনি যাওয়ার আর কী প্রয়োজন!
কলিং বেল বাজার শব্দ শুনে আমি দরজা খুলে দিলাম। সেতারা খালা এসেছেন।
” খালা, আপনি ইদের দিনে!”
” হ খালা, আপনেরে দেখতে আসলাম।”
” আপনার শাড়িটা তো খুব সুন্দর। লাল রঙের শাড়িতে আপনাকে সুন্দর লাগছে।”
” সেই কথাই তো বলতে আসছি খালা। কাল রাতে একজন একটা জাদুর বাক্স দিয়ে গেল। বাক্স খুলে দেখি ভেতরে এই শাড়ি আর এই রঙের একটা পাঞ্জাবি। পুরাই অবাক হইছি। কে যে এই জাদুর বাক্স দিলো, কিছুই জানি না। যে দিছে আল্লাহ তার বহুত ভালা করব। এইরকম ভালা মানুষ নাই। বেশিরভাগ মানুষ তো দান করে লোক দেখানোর জন্য।”
” শাড়িটা কিন্তু আসলেই সুন্দর। “
” আপনের খালুর পাঞ্জাবিটাও সুন্দর। দুইজনে ঘুরতে বের হইছি। আপনের খালুর রিকশা করে ঘুরতাছি। আজ সে অন্য কোন প্যাসেঞ্জার নিব না, আমারে নিয়াই ঘুরব।”
” খালুকেও উপরে নিয়ে আসেন, দেখি উনাকে।”
” লাল পাঞ্জাবি পরছে তার জন্য না-কি তার লজ্জা লজ্জা লাগতেছে। উপরে আসব না।”
” আপনি তাহলে বসেন। কিছু খেয়ে যান। খালুর জন্য একটা বক্সে করে খাবার দিয়ে দেই।”
” না খালা। কিছুই খাব না। পেট ভরা একদম। এখন যাই, আপনার খালু রিকশা নিয়া রোদে দাঁড়াইয়া আছে।”
আমি সেতারা খালার বের হয়ে যাওয়াটা দেখলাম। আমার স্বামী টিভির রুম থেকে বের হয়ে এসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন, ” অনলাইন থেকে এইজন্যই কিছু কেনাকাটা করতে মানা করি। তুমি হালকা লাল রঙের শাড়ি অর্ডার করলে আর কেমন টকটকে রঙের শাড়ি দিয়ে দিলো, দেখলে?”






