আজ সিঁবু ডোমের মন খুব ফুরফুরে। মালতী মাগী আজ তাঁকে খুব আদর করেছে। সকাল-সকাল শিং মাছের ঝোল আর করোলা ভাজি দিয়ে গরম-গরম ভাত রেঁধে খাইয়েছে, তারপর গতকাল রাতে আনা কড়া বাংলা মদ নিজ হাতে ঢেলে দিয়েছে মালতী। মাগিটা যেদিন এমন আহ্লাদী হয়, সেদিন সিঁবু তাঁর জীবনের সব দুঃখ ভুলে যায়। ভুলে যায় লাশ কাটা ঘরের পচা মাংসের গন্ধ, কিংবা প্রতিদিনের বস্তি-জীবনের টানাটানির গল্প। আরও ভুলে যায়, তাঁর বউয়ের ঘরে প্রতি রাতে বসা নাগরদের আসরের নগ্নতা, ঘৃণা….আক্ষেপ…. সব।
আজকে একটি লাশের পোস্টমর্টেম করার ডাক এসেছে সিঁবু’র। দুপুর ১২.০০ টায় যেতে হবে। কিন্তু সিঁবু আজ একটু আগে-আগেই বের হলো বাড়ি থেকে। ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মালতী তাঁকে একটি পান বানিয়ে দিলো। কাঁচা সুপারি আর সুরভী জর্দার মিশেলে মিষ্টি পানের মাদকের গন্ধে সিঁবু’র ভেতরেও একটা মাদকতা জাগলো। সেই মাদকতার আতিশয্যে মালতীকে জাপটে ধরলো। মালতীও আজ না করলোনা। অন্যদিন হলে পাল্টা ঝাপটায় মালতী সিঁবু’কে ঠেলে সরিয়ে দিতো। গভীর আলিঙ্গনের আড়ালে সিঁবু আজ দিনের শুরুতেই পাওয়া আদরের ষোলআনা ফেরত দিলো মালতীকে প্রতি-আদরে। আজ মালতী যেনো ভরা বর্ষা, সিঁবু ইচ্ছে মতো বর্ষায় গা ভিজিয়ে ১১ টার পরপরই বের হলো লাশকাটা ঘরের উদ্দেশ্যে। আসার সময় মালতী মদের বোতলটা হাতে ধরিয়ে দিলো। সিঁবু’র জীবনে এমন সকাল আসে কদাচিত। রাত তো আসেই না। রাতে মালতী নাগরদের মনোরঞ্জনে বিভোর থাকে। নাগরের আসরে সিঁবু’র জায়গা নাই! তাই সে রাস্তায় কিংবা পাড়ার মদের আসরে মাতলামি করে রাত কাটায়। ভোরে যখন ঘরে ফিরে, তখন সারা রাতের ক্লান্তি নিয়ে মালতী ঘুমিয়ে থাকে। মালতীর উদোম শরীরে রাতের নাগরদের সুখের চিহ্ন উঁকি মারে। সিঁবু ঘেন্নায় অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই চলছে, এভাবেই চলবে সিঁবু’র দিন।
সিঁবু রাস্তায় বের হয়েই একটি বিড়ি ধরিয়ে আয়েশ করে টানতে-টানতে লাশকাটা ঘরের দিকে এগোতে থাকলো। লাশকাটা ঘর তাঁর বাসা থেকে বেশি দূরে নয়। হেঁটে আসতে ১০/১৫ মিনিট সময় লাগে। আজ ঝকঝকে দিন। সুর্য্যটাকে মালতীর মতোই কামুক লাগছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে দক্ষিণ দিক হতে। রাস্তায় বেশ গাড়ী। মাঝে-মাঝে এই শহরটাকে রঙীন কাপড়ে জড়ানো সঙ মনে হয় সিঁবু’র।
লাশকাটা ঘরের সামনে এসে সিঁবু গুন-গুন করে গান ধরলো,
‘আজ ছকালে বউ হামাকে আদর করিচে…..
ভালবাছার ঝর্ণাধারায় ভাছিয়ে দিয়েচে….
আজ ছকালে বউ হামাকে আদর করিচে!’
গান গাইতে-গাইতে সে লাশকাটা ঘরের তালা খুললো। সাহেবরা আসতে এখনও দেরি আছে। সিঁবু ঘরে ঢুকে একটি টুলে বোসে হাতের বাংলা মদের বোতলের সিপি খুললো। তারপর সবটুকু মদ ঢকঢক করে একটানে গিলে ফেললো। এই মদ আর মালতী, দুইটা মাত্র সুখ সিঁবু’র এই জনমে। মালতী মাঝে-মাঝে সুখ, যেমন আজ সকালে। কিন্তু মদ সব সময়ের বিশ্বস্ত সুখ-সহচর। মদ আছে বলেই সিঁবু’র দিনগুলো আনন্দে কাটে। কপালের লিখা কষ্টগুলোয় হিমেল পরশ বুলিয়ে দেয় এই মদের বোতল। এটা মালতীর থেকেও বেশি! তাই সে মদের বোতলকে সব সময় খালি করে কপালে ঠেকিয়ে কুর্নিশ করে, তারপর একপাশে যত্ন করে রেখে দেয়। আজও তাই করলো। খালি বোতলটা রাখতে-রাখতে জড়ানো কণ্ঠে আবার গাইতে শুরু করলো,
‘আজ ছকালে বউ হামাকে……’
গাইতে-গাইতে একটি রঙিন চাদরে মোড়ানো লাশের কাছাকাছি এলো। লাশের সাথের টিকিটে নাম লেখা ম-হু-য়া। সিঁবু মুর্খ হলেও বানান করে টেনে-টেনে একটু-আধটু বাংলা পড়তে পারে। রাতের স্কুলে পড়ে একটু শিখেছে। সাহেবরা পরে আসুক, তার আগে সে লাশের শরীর থেকে কাপড়-চোপড় খুলে উদোম করবে। সাহেবরা এসেই যেনো দ্রুত কাজ সেরে ফেলতে পারে। সিঁবুও আজ দ্রুত বাড়ি ফিরে গিয়ে দুপুরে আবারও মালতীকে ভালবাসবে। আজ মাগীটা ঢলোঢলো মেজাজে আছে।
সিঁবু প্রথমেই লাশের শরীর থেকে চাদরটা খুলে ফেললো। তারপরে শরীরের পোশাক খুলতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। একটি ফুটফুটে মিষ্টি মেয়ে, মেয়েটি তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। লাশের দিকে প্রথমবার তাকিয়ে সিঁবু থতমত খেয়ে গেলো। লাশটা মনে হচ্ছে সিঁবু’র সাথে কথা বলবে! সিঁবু একটু পিছিয়ে এসে লাশকাটা ঘরে রাখা তাঁর জন্য প্রতিদিনের বরাদ্ধ করা মদের একটি বোতল খুললো। ঢকঢক করে কয়েক ঢোক মদ গিলে আবারও লাশের কাছে এলো। একি! এ তো মালতী! মালতী লাশকাটা ঘরে লাশের ভেতরে এলো কিভাবে! সিঁবু হকচকিয়ে লাশের মুখের কাছে মুখ নামালো! মালতী মাগি আজ এমনই ক্ষেপেছে যে, লাশকাটা ঘরেই চলে এলো সোহাগ নিতে! সিঁবু আলতো করে মালতীর কপালে একটা চুমু খেলো। তারপরে জড়ানো গলায় বিড়বিড় করতে থাকলো,
–মালতী! মালতী তুকে হামি আজ কাটবো। আজ তুকে কেটেকুটে তোর সব নাগরের আদর ধুয়ে দিব। তুই হামার। কারও কাছে তুকে আর বিকোতে দিবোনা। বলেই সে মাতাল হয়ে লাশটকে আলিঙ্গন করতে থাকলো। তারপর মালতীর শরীরের জামা ধরে টান দিতেই মালতী চিৎকার দিয়ে উঠলো….
—ওরা হামাক মারি ফেলিচে, তুইও কাটবি? তুইও খুন করবি হামাক? বলেই লাশটি উঠে বসলো। সিঁবু আরেক ঢোক মদ খেলো। তারপর দেখলো, না, এ তো মালতী নয়! একটি কচি বয়সের মেয়ে! মিষ্টি চেহারার অপ্সরী। মেয়েটি ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর বলছে,
–জানো, গতরাতে ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে। মারার আগে আমাকে….আর বলতে পারছেনা লাশটি। লাশটি অঝোরে কাঁদছে। সিঁবু কিছু বুঝে উঠতে পারছেনা। মেয়েটি শুধু বলছে,
–ওরা আমাকে খুন করেছে, ওরা আমাকে খুন করেছে। আমি মরতে চাইনি। আমি সব দিয়েছে, তবুও ওরা আমাকে খুন করেছে, ওরা আমাকে মেরে ফেলেছে!
সিঁবু আবার পিছিয়ে আসলো লাশের কাছ থেকে। সে এবার বোতলের বাকি মদটুকু এক টানে খেয়ে ফেললো। তারপর দেখলো মালতী কাঁদছে আর বলছে,
–ওরা হামাক খুন করিচে, ওরা হামাক খুন করিচে!
তারপর সিঁবু’র মনে হচ্ছে পুরো লাশকাটা ঘর একসাথে চিৎকার করছে, ‘খুন…খুন…!’ ঘরের তাকে রাখা সবগুলো লাশ বেরিয়ে এসে একসাথে চিৎকার দিচ্ছে,
–খুন…খুন!
এসব দেখে সিঁবুও চিৎকার দিলো,
–খুন….খুন! ওরা হামার মালতী’ক খুন করিচে। মালতী! আমার মালতী! খুন…খুন! চিৎকার দিতে-দিতে দেয়ালে মাথা ঠুকছে সিঁবু।
এমন সময় পোস্টমর্টেম-এর পুরো দল লাশকাটা ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে সিঁবু’র অবস্থা দেখে একজন বললো,
–আজ বদমাশটা এতো গিলেছে যে, তাঁকে দিয়ে কাজ হবে না। তিনি সাথে থাকা নিরাপত্তা প্রহরীকে নির্দেশ দিলেন মাতালটাকে এক্ষুনি পাছায় লাত্থি দিয়ে বের করে দাও। আর বীরেণ ডোমকে ডেকে আনো।
আজকের রাতেও মালতীর ঘরে কোনো নাগর এলোনা। সিঁবু মালতীর কোলের উপরে মাথা রেখে টিভি দেখছে। মালতী সিঁবু’র মাথায়, মুখে, বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সিঁবুও মাঝে-মাঝে মালতীর শরীরে মুখ ঘুষছে আর অমর সুখের তালাশে হাত চালাচ্ছে শরীরের আদ্যোপান্ত। এমন সময় টিভিতে একটি খবরে চোখ ও কান একসাথে আটকে গেলো সিঁবু’র….
‘গতরাতে মহুয়া নামের যে কিশোরীর লাশ পাওয়া গিয়েছিলো তাঁর নিজ কক্ষে, সেটি আত্মহত্যাই, খুন নয়। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেয়ে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।’
স্ক্রীনের ছবিতে দেখানো মুখটি খুব চেনা। মুখটা সিঁবু’র দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।
০৫.০৫.২০২১/রাজশাহী।
- Md. Mosiur Rahman





