ক্লিপ্টোম্যানিয়াক ৬ষ্ঠ পর্ব

আমাদের তরফ থেকে এনগেজমেন্ট এর দিন হঠাৎ করেই পোস্টপোন করা হয়েছে। জানানো হয়েছে বাবা হঠাৎ করেই অসুস্থ ফিল করছেন। ডাক্তার কমপ্লিট রেস্টে থাকতে বলেছেন। তবে আসল কাহিনী একটু অন্যরকম। 

আমাকে দেখে যাওয়ার দিন সাতেক পরেই পাত্রপক্ষ জানায় বিয়েতে ওদের মত আছে। আমরাও খুশিতে ডগমগ হয়ে যাই। বাট কিছুদিনের ভেতরেই মায়ের কোন এক গোয়েন্দা জানায়, কাহিনী নাকি এতোটা সিম্পল না। আমাকে ছেলের পছন্দ হলেও, বাসার মুরুব্বীদের আমাকে পছন্দ হয়নি। উনাদের যুক্তি, মেয়ের বয়স বেশি। উনারা সম্ভবতঃ আরেকটু কমবয়সী খুঁজছিলেন। যাইহোক, অবশেষে উনারা মত দিয়েছেন, বা সৎ বাংলায় বলা যায়, মত দিতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ ছেলে গোঁ ধরেছে, এই মেয়েকেই বিয়ে করবে। 

এসব শুনে কেন যেন আমি কিছুটা গর্ব বোধ করলাম, পাত্রী হিসেবে নেহাত হেলাফেলা আমি না। অন্ততঃ একজন পাত্রের মাথা ঘুরিয়ে দিতে পেরেছি। অন্যদিকে মা পড়ে গেছেন বেশ দুশ্চিন্তায়। এমন পরিবারে আমাকে পাঠাবেন কি না, যেখানে পরিবার আমাকে অপছন্দ করেছে। 

দুশ্চিন্তা আমারও যে হচ্ছে না, এমন না। খুব ভুল যদি না করে থাকি, আমার ধারণা, আমার ক্লিপ্টোম্যানিয়াক স্বভাবের কথা জনাব পাত্র তাঁর পরিবারকে জানায়নি। কোন ভাবে যদি উনারা জানতে পারেন তখন কি হবে? ভাবতেই ভয় লাগছে।

তো কাহিনীর সারাংশ হচ্ছে, এই মুহূর্তে আমার এনগেজমেন্ট সাসপেন্ডেড অ্যানিমেশানে আছে। ওদেরকে ‘না’ না বলে কম্প্রোমাইজ ফর্মুলা হিসেবে আপাততঃ, বাবার শরীরের বাহানা দিয়ে এনগেজমেন্টটা ডিলে করা হচ্ছে। তবে এটা যে সলিউশান না, সেটা মা জানেন। এটাও জানেন, বেশি ডিলে করলে, প্রস্তাব হাতছাড়া হয়ে যাবে।

তবে আমাকে ভোগাচ্ছে অন্য টেনশান। কিছুদিন আগে যে মিতু দেখা করতে এসেছিল আমার স্কুলে, সেই টেনশান। সেই মিতু ইন্সিডেন্টের পরে আমি নিজেও বেশ পাজলড হয়ে যাই। সারাক্ষণ মনের ভেতরে ঘুরতে থাকে, কে এমন আছে যে আমার হয়ে প্রলয়ের সাথে ফাইট করছে? সরি বলাতে চাইছে ওকে দিয়ে। আর ঠিক কোন ঘটনার জন্য? তিন বছর আগের ইন্সিডেন্টের জন্য? না সেদিনের, বুটিকের ঘটনার জন্য? 

এর উত্তর পেতে হলে আগে জানতে হবে, আমার আর প্রলয় সম্পর্কে সে কতোটুকু জানে? আর আসলে কি চাইছে? আমাদের প্যাচ আপ? অনেক ভেবেছি, পাজল সলভ হয়নি। 

লজিক বলছে, যে ই কাজটা করে থাক, সেদিনের বুটিকের ঘটনার জন্যই কাজটা করছে। কারণ তিন বছর আগের ঘটনার রাগ, এখন ঝাড়তে আসাটা আনলাইকলি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে সেদিনের ঘটনাটা কে কে জানে। আমি মিতু আর প্রলয় ছাড়া বুটিকের ঘটনাটা জানে কেবল শম্পাদি। কিন্তু শম্পাদি কাউকে বলেননি। জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাহলে?  আর কে? 

কেন যেন ঘুরে ফিরে একটা সম্ভাবনাই মাথায় আসছে, সেই এমবিএ পাত্র। আমার সম্পর্কে জানবার জন্য যে ডিটেকটিভ লাগাতে পারে তার জন্য আমার কান্না ইনভেস্টিগেট করতে ডিটেকটিভ লাগানো অসম্ভব কিছু না। আর তেমনটা হয়ে থাকলে, আই মিন উনি যদি পুরো ব্যাপারটা জেনে থাকেন, তাহলে হয়তো… খুবই ক্ষীণ, তবে পসিবিলিটি। 

কিন্তু…  আই মিন… প্রতিশোধ নেয়ার মত সেদিন কি তেমন কিছু ঘটেছিল? ঘটনাটা এম্ব্যারাসিং, ইন্সাল্টিংও, তবে… প্রতিশোধ নেয়ার মত কি? উনি কাজটা করে থাকলে, ব্যাপারটা উনাকে বোঝাতে হবে। জানাতে হবে সেদিন যেটা ঘটেছিল সেটা আসলে তিন বছরের আগের ঘটনার এক্সটেনশান। 

প্রমি নামটা দেখে আমার সন্দেহ হলেও, কেন যেন মাথায় আসতে দিই নি সন্দেহটা। কিন্তু সেটাই ঘটল। ‘প্র’ হিসেবে প্রলয় ঠিকই আছে, শুধু ‘মি’ হিসেবে মিনুর জায়গায় এসে গেছে মিতু। ও কি নামটা ঠিক রাখবে ভেবেই মিতুর সাথে প্রেম করেছে?

এনিওয়ে, ড্রেসটা তখন আমার পড়ার মত করে অ্যাডজাস্ট করে দিয়েছে মিতু। সময় এগিয়ে আসছে দেখে আমি আর শাড়ি পড়ার রিস্ক নিই নি। দ্রুত পেমেন্টটা করে নতুন কেনা ড্রেসটা পড়েই আমি যখন বেরিয়ে আসছি, ঠিক তখনই প্রলয় বুটিকে ঢুকছিল। ওকে দেখে আমি রীতিমত থমকে যাই। পা আটকে গিয়েছিল। নড়তে পারছিলাম না। কিন্তু ওর চোখে তেমন কোন আবেগ ছিল না। তারপরও কেন যেন নিজের অজান্তেই অপেক্ষা করে ছিলাম, মন বলছিল সেই কিলার স্মাইল দিয়ে বলবে, ‘তুমি? এখানে?’ 

তেমন কিছু ঘটল না। মিতু ওর দিকে তাকিয়ে একটা স্মাইল দিলেও সেটা ইগনোর করল। এরপরে মিতু যখন ‘ও মিনু… আমাদের বুটিকের প্রথম কাস্টমার…’ বলে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিতে যাচ্ছিল তখন প্রলয় বিষাক্ত গলায় হিসহিস করে আমার দিকে তাকিয়ে মিতুকে জিজ্ঞেস করেছিল, “এই চোরনি এখানে কেন?’ 

কথাটা বলে সেখানে আর থাকেনি প্রলয়। ভেতরে চলে যায়। মিতু দাঁড়িয়ে ছিল হতভম্বের মত। আমি দ্রুত বেরিয়ে আসি দ্রুত। চোখ ফেটে কান্না আসছিল।

আর, আমার সেই কান্না মিস্টার এমবিএ দেখেছিলেন। আর উনার কথাবার্তায় যেহেতু মনে হচ্ছে আমাকে উনি পছন্দ করতে শুরু করেছেন, তাই সরি বলার হুমকি দেয়া তাঁর জন্য অসম্ভব না। হবু বউকে অপমান করার প্রতিশোধ?

আচ্ছা, প্রলয়ের সরি বলায় একটা রিস্কও তো আছে। ওর সরি বলাতে যদি আমি খুশি হয়ে যাই? সব অভিমান ভেঙ্গে যায়? কিংবা আবার প্যাচ আপ হয়ে যায়? কি আবোলতাবোল ভাবছি?

এই যখন সিচুয়েশান, তখন আমার মোবাইলে ফোন আসে সেই মিস্টার এমবিএর। জানায়, আমার সাথে কথা বলতে চায়। সম্ভবতঃ আমাদের তরফের ডিলে নিয়ে আলাপ করতে চান। হতে পারে ওদের পক্ষের কোন গোয়েন্দা, আমাদের বাসার খবর ঐ বাসায় দিয়েছে। বাসায় যা অবস্থা, মনে হচ্ছে আমাকেই নিতে হবে ফাইনাল সিদ্ধান্ত। আর সেটা নিতে হলে উনার অবস্থানটা আমার জন্য জানা জরুরী। বিশেষ করে আমার সবকিছু জানার পরে। অবশ্য এই মুহূর্তে কেন তিনি এ বিয়েতে মত দিয়েছেন, সেটাও জানতে মন চাইছে। মানে আমার প্রেমে পড়েছেন কি না? 

প্রশ্ন অবশ্য আমার আরও একটা আছে, সেই হুমকি ঘটনার সাথে উনি জড়িত কি না।  সেটা হয়ে থাকলে উনাকে আটকাতে হবে। প্রলয় সেদিন যা করেছে, সেটা অন্যায়। বুটিকে আসা একজন কাস্টমারকে চোরনী বলা কিংবা দোকান থেকে বেরিয়ে যেতে বলা… অবশ্যই অপমানজনক। কিন্তু তাই বলে ওদের ব্যাবসাটা নষ্ট করাটা একটু ওভাররিয়াক্ট হয়ে যায়। 

এনিওয়ে, এই মুহূর্তে আমি সেই ক্যাফেতে বসে আছি। ভালো রকম টেনসড। মাঝে মাঝে এমন হয় না, যে মন বলে আজকে কিছু একটা ঘটবে? আজকে তেমনি একটা ফিলিং হচ্ছে। মন বলছে কিছু একটা ঘটবে। দারুণ কিছু। গেম চেঞ্জার টাইপ। কাহিনী আমূল পাল্টে দেবে। কিন্তু কি সেটা, কে ঘটাবে, কোথায় ঘটবে, সেসবের কিছুই ফিল করতে পারছি না। 

না, আমি জ্যোতিষী না, কিংবা আমার তেমন কোন সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার নেই। এমন না যে এমন অনুভূতি আমার প্রায়ই হয়, কিংবা হলেই তা ফলে যায়। আসলে আমি বোধহয় এক্সাইটেড হয়ে আছি… এবং সেটা সম্পূর্ণ অন্য কারণে

যদিও উনি সময় দিয়েছেন ছটা, তারপরও আমি চারটায় এসেছি। সেদিনের মত। মনের কোণে একটা সম্ভাবনা কিলবিল করছে, যদি সেই ক্লিপ্টোম্যানিয়াকটাকে আবার দেখতে পাই।

এই ফাঁকে চুপ চুপ করে আরও একটা কথা জানিয়ে রাখি। জানি এটা পাগলামি, তারপরও, করেছি। ইয়েস, এই ক্যাফেতে আসবার ব্যাপারটা শুধু আজকেই করেছি, এমন না। এই কদিনে, আমি বার দুয়েক এই ক্যাফেতে আগেও এসেছি। আর একবার ওকে দেখতে চাই। কেন চাই? নট সিওর। জাস্ট চাই। 

আসলে সেই ক্লিপ্টোম্যানিয়াক কেন এভাবে মনের ভেতরে গেঁথে গেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই কিলার স্মাইল দেখতে পাচ্ছি। ব্যাপারটা কারো সাথে শেয়ারও করতে পারছি না। শম্পাদিকে বললে বকা খাবো। ‘এসব ভীমরতি বাদ দে।’  মাকে বললে মনে হয় অজ্ঞান হয়ে যাবেন। তাই ব্যাপারটা নিজের ভেতরে রাখা ছাড়া উপায় নেই।

সময় এগিয়ে যাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে একটা টেনশান ফিল করছি। মনে হচ্ছে হার্ট বিট নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছি। কি করব ভাবছি। একবার কি ফোন করব মিস্টার এমবিএ কে? বলবে একটু আগে আসতে পারবেন কি না? কিংবা মিতুকে? জানতে চাইব, প্রবলেম সলভ  হয়েছে কি না? নাহ, কোনটাতেই মন সায় দিচ্ছে না। 

বার কয়েক ফেসবুকিং ট্রাই করলাম। মনোযোগ বসছে না। বারে বারেই চোখ চলে যাচ্ছে সেই টেবিলের দিকে। মনে মনে হাসলাম। যদি আসেও, আবার কি সেই টেবিলেই বসবে? আর এটা কেন ভেবে নিচ্ছি, ও এনেগেইজড না। দেখতে তো খারাপ না। প্রেমিকা থাকতেই পারে। দেখা যদি হয়েই যায়, কি বলব? ‘আমিও আপনার মত ক্লিপ্টো?’ না ‘আপনার স্মাইলটা একদম আমার এক্সের মত?’

এক কাপ কফি খাওয়া যেতে পারে। ঘাড় ঘুরিয়ে ওয়েটারের খোঁজ করলাম। যথারীতি গল্প করছে। আঙ্গুল উঁচিয়ে বোঝালাম, আমার কিছু বলার আছে। একজন এগিয়ে এল। অর্ডার দিলাম। এরপরে ঘাড় ঘুরিয়ে সোজা হতে গিয়েই ভূত দেখার মত রীতিমত চমকে উঠলাম। হোয়াট দ্যা ফা…।

— হাই

চলবে

Razia Sultana Jeni

Send private message to author
What’s your Reaction?
1
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!