ক্লিপ্টোম্যানিয়াক ৭ম পর্ব

ছেলেদের প্রেমে পড়া আর মেয়েদের প্রেমে পড়ার ব্যাপারটা যদি কম্পেয়ার করি, ছেলেরা একটা অ্যাডভান্টেজ এঞ্জয় করে। ওরা প্রপোজ করতে পারে। মেয়েরা পারে না, এমন না। বাট সেটা নর্ম না। মেয়েদের অপেক্ষা করতে হয়, কখন প্রপোজ করবে। বান্ধবীদের জানানো যায়, তবে ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখাটাই নিয়ম।

এনিওয়ে, ক্লিপ্টোম্যানিয়াকের যখন প্রেমে পড়েছিলাম, তখন একটা ব্যাপার একেবারেই ভাবিনি। আর সেটা হচ্ছে ও কি ভাবছে আমার সম্পর্কে। সে ও কি ইন্টেরেস্টেড? আসলে এধরণের লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ব্যাপারগুলোতে, এতো ভাবনা চিন্তা ইউজুয়ালি হয় না। ব্যাপারগুলো ভালোলাগা স্টেজে কিছুদিন থেকে পরে একসময় মন থেকে মুছে যায়। আমার ক্ষেত্রেও হয়তো সেটা হবে। ওর স্মাইল আর ক্লিপ্টোম্যানিয়াক ন্যাচার একটু ভোগাচ্ছে। ভুলতে সময় লাগবে হয়তো। তবে ভুলে যাব আই গেস। 

আর আজকের পরে তো…। সেই এমবিএ ভদ্রলোকের সাথে আজ বেশ স্বাভাবিক পরিবেশে আলাপ হল। আজকে আমার চোখে সেদিনের মত টইটুম্বুর পানি নেই। উনাকেও অনেকটাই হাসিখুশি লাগল। সেদিন যখন জানিয়েছিলাম আমি ক্লিপ্টোম্যানিয়াক, সেটা শুনে উনি কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন। মানে না বুঝলেও সেটা আমাকে বুঝতে দেননি। মুখে বলেছিলেন, আই সি। এটার মানে অ্যাক্সেপ্ট করে নেয়া, না রিজেক্ট করা, ব্যাপারটা তখনও ডিস্ক্লোজ করেননি। আসলে উনার মনে তখন বোধহয় অন্য চিন্তা ঘুরছিল, আমি আসলে এই বিয়েতে মন থেকে রাজী, না পারিবারিক চাপে রাজী। 

— আমার মনে হয়, আমরা আরেকদিন মিট করি।

সেদিন আলাপচারিতা সেভাবে জমেনি। কেমন কাটাকাটা, ইন্টারভিউ ইন্টারভিউ টাইপ প্রশ্নোত্তর হচ্ছিল। মন আমার রীতিমত বিষিয়ে ছিল। তাই আরেকদিন মিট করার প্রস্তাবে আমিও সম্মতি দিয়ে দিই। 

সেই মিটটা হল আজকে। ভেবেছিলাম, আজ অন্ততঃ সাবলীল আলাপচারিতা হবে। একেবারে হয়নি, বলব না, তবে আজও ডিস্ট্র্যাকশান কাজ করেছে। বাট, অ্যা লিটল লেস। আজ যখন উনাকে অনেক সাবলীল মনে হল। ভদ্রলোক আজ নিজের সম্পর্কে অনেক কিছু বললেন। উনার নাম সোহরাব হোসেন। নামটা পছন্দ হল না। আরও যা যা বললেন, তার সারাংশ হচ্ছে, ইয়াং বয়সে উনার একটা অ্যাফেয়ার ছিল। মেয়েটার নাম রাখি। টেকেনি। ঠিক টেকেনি না, আসলে মেয়েটার যখন ভালো একটা বিয়ের প্রস্তাব আসে, তখন সোহরাব সাহেবের কোন চাকরী নেই। এরপরে যা হয়, মেয়েটা পরিবারের চাপে সারেন্ডার করে, আর সোহরাব সাহেব একরাশ দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে, ব্যাপারটা হজম করেন।

এরপর থেকে মনে হয় উনার ধারণা জন্মায়, একটি মেয়েকে খেতে পড়তে দেয়াটাই একজন পাত্রের একমাত্র যোগ্যতা। সেটাই আজকে জানালেন। উনার সাথে বিয়ে হলে আমার খাওয়া পড়ার সমস্যা হবে না। উনাকে দোষ দিচ্ছি না। গার্জেনরা তো এসব ব্যাপার দেখে সিদ্ধান্ত নেন, পাত্র ভালো কি না। আলাপ চারিতার বেশ অনেকটা অংশ জুড়েই ছিল উনার চাকরী, ওপরে ওঠার সম্ভাবনা, ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ আদর্শ পাত্রের প্রায় সব যোগ্যই উনার আছে। সেই সাথে দেখতে খারাপ না, ঢাকায় নিজেদের বাসা আছে। আর কি চাই।

তবে মজার ঘটনাটা ঘটে, তার কিছুক্ষণ আগে। ভদ্রলোক যখন এসে পৌঁছলেন তখনও আমি পুরোপুরি স্বাভাবিক হইনি। ঠিক অস্বাভাবিক না, বলা যায়, মনে একটা মিষ্টি আনন্দের আবেশ কাজ করছিল। আসলে একটু আগের ঘটনায় আমি এতোটাই অবাক হয়েছিলাম, যে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না…। 

কফির অর্ডারটা দিয়ে ঘুরেই যখন দেখি সামনের চেয়ারে প্রলয় বসে আছে, তখন, অনেস্টলি স্পিকিং, আঁতকে ওঠার মত অবস্থা হয়েছিল। এরপরে যখন সেই কিলার স্মাইল দিয়ে বলল ‘হাই’ তখন সত্যিই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এরপরে এলো দ্বিতীয় বক্তব্য

— কেমন আছো?

কি উত্তর দেব বুঝতে পারছিলাম না। ‘ভালো আছি’ বলব, না ‘এখানে কেন?’ জিজ্ঞেস করব। আমি কেমন আছি জানবার সত্যি কোন আগ্রহ প্রলয়ের নেই। ও এসেছে অন্য কোন কারণে। আর ওর মুখের হাসি বলে দিচ্ছে, এসেছে নিজের ধান্ধায়। আর তেমনটা হলে, কারণ একটাই, সেই থ্রেট। মিতু যেটা সেদিন বলেছিল। 

সেদিনের পরে মিতুর সাথে আর কথা হয়নি। সো জানি না, সেই থ্রেট শুধু থ্রেট হিসেবেই থেকে গেছে, না একজিকিউশান হয়েছে। ওদের প্রেমের কি অবস্থা? আছে, না ভেঙ্গেছে? মাথায় একসাথে এতোগুলো চিন্তা কাজ করছিল যে মুখে কিছুই আসছিল না। প্রলয় এবার কথাটা বলল

— আই অ্যাম সরি। সেদিন তোমার সাথে এভাবে বিহেভ করা ঠিক হয়নি।

সো, আই অ্যাম রাইট। সরি থ্রেটের আফটার ইফেক্ট। অবাক হলাম না। কিন্তু মনের ভেতর যেসব প্রশ্ন ঘুরছিল, সেসবের উত্তর সেই সরি স্টেটমেন্টে ছিল না। তাই জিজ্ঞেস করলাম

— তোমাদের বুটিকের কি অবস্থা?

আমার দিকে তাকাল। মনে হল চোখের কোণে একটা অসহায়ত্ব দেখলাম। মুখে বলল

— উই আর নট টুগেদার।

মানে প্রেম ভেঙ্গে গেছে। মিতু ঠিক করেছে না ভুল, জানি না, তবে আমার কেমন যেন আনন্দ লাগল। জানি, আচরণটা বাংলা বা হিন্দি সিনেমার ভ্যাম্পদের মত হয়ে যাচ্ছে, তারপরও, হল। নিজের অজান্তেই চোখে একটা দুষ্টুমির হাসি চলে এলো। নিজের অজান্তেই মুখেও চলে এলো বিষাক্ত ভাষা। বললাম

— এখন?

প্রলয়ের চোখের ভাষা ঝট করে পাল্টে গেল। একরাশ ঘৃণা ওখানে। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিল। বেশ মোলায়েম দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালো। এরপরে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল

— আর কি করলে তুমি আমাকে মুক্তি দেবে?

চোখে অনুনয়। বেচারা। মনে হচ্ছে বেশ ভালো রকম চিপায় পড়েছে। প্রেমিকা হাতছাড়া। সেই সাথে সম্ভবত ডিজাইনারের চাকরীটাও গেছে। ওয়েটার কফি দিতে আসলে ওকে বললাম আরেকটা দিতে। প্রলয়ের কফি বেশ পছন্দ। ইনফ্যাক্ট আগে ওর সাথে ডেটিং এ গেলে আমাদের মেনুতে এটা থাকতোই। 

ওয়েটার চলে গেলে প্রলয়ের দিকে তাকালাম। বেচারা সত্যিই বুঝে উঠতে পারছে না কি করবে। কেমন যেন মায়া লাগছে। হাসি হাসি মুখেই বললাম

— একটা কথা বললে বিশ্বাস করবে কি না জানি না, বাট ইট’স ট্রু, আমি সত্যিই জানি না কে করছে এসব।

— মানে?

— মানে, এসব ম্যাসেজ, হুমকি…

— জানো না মানে? 

গলার আওয়াজ কিছুটা চড়ে গেল। এরপরে আবার নিজেকে শান্ত করে মোলায়েমভাবেই বলল

— সরি

ব্যাপারটা এঞ্জয় করলাম। রগচটা প্রলয়ের এই ফাঁদে পড়া অবস্থাটা বেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছিলাম। শান্ত স্বরেই উত্তর দিলাম

— জানি না মানে, জানি না। আই হ্যাভ নো আইডিয়া।

বিশ্বাস করল না। নিজেকে বেশ নিয়ন্ত্রণে রেখেই, শান্ত স্বরে বলল

— রাস্তা ঘাটের কেউ তো একাজ করবে না, হয় তুমি কাউকে বলেছো, আর নয়তো…

— নয়তো?

প্রলয়ের গলার আওয়াজ আবার কিছুটা উঁচু হয়ে গিয়েছিল। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিল। তবে পরের কথায় একরাশ হতাশা ঝড়ে পড়ল। বলল

— আমাকে গতকাল পুলিশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

এবার আমি নিজেও আকাশ থেকে পড়লাম। প্রথমবারের মত ফিল করলাম আমার সেই ওয়েলউইশার কাম হুমকিদাতা বেজায় শক্তিশালী ক্যারেক্টার। শুধু তা ই না, যে ব্যাপারটাকে হালকা দুষ্টুমি ভাবছিলাম, সেই কাহিনীই এখন বেশ জটিল আকার নিয়ে ফেলেছে। নিজের অজান্তেই মুখে দিয়ে বেরিয়ে আসল

— পুলিশ?

মাথা নোড করল। বলল

— আমি নাকি বুটিকের টাকা চুরি করেছি।

— কে কমপ্লেইন করেছে? মিতু?

মাথা দুদিকে নেড়ে বলল

— না।

— তাহলে?

— প্লিজ স্টপ দিস।

— আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমার দিকে তাকাল প্রলয়। আমার হতবাক চেহারা হয়তো বুঝতে পারল আমি আসলেই কিছু জানি না। তাই এবার খুলে বলতে শুরু করল 

— পুলিশ বলছে, অনলাইনে এফআইআর করেছিল মিতু। 

— মিতু করেনি?

— ইয়েস। মিতু বলছে ও এমন কিছু করেনি। 

— কথা হয়েছে মিতুর সাথে?

— ইয়া। আজ সকালে মিতু পুলিশে গিয়ে কমপ্লেইন উইথড্র করেছে। তারপর ছাড়া পেয়েছি।

— মিতুর সাথে তো ব্রেকাপ হয়ে গেছে বললে।

এবার বেশ কড়া চোখে তাকাল আমার দিকে। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল

— ইয়েস। দুই দিন আগে মিতু আমাকে জানায়, আমার জন্য ও কোন ঝুঁকি নিতে রাজী না। ডিজাইনার হিসেবেও আমাকে আর দরকার নাই। 

আমার মাথায় তখন চিন্তার ঝড় চলছে। হু ইজ দিস গাই? মিস্টার এমবিএ? যদি উনি হয়ে থাকেন, রিয়েলি হ্যাটস অফ টু হিম। কিভাবে করেছে জানি না, বাট কাজের কাজ করেছে একটা। তিন বছর আগে করা যে অপমান মনের কোণে জমে ছিল, সব কেমন যেন শান্ত হয়ে গেল। প্রলয় দুই হাত সামনে এনে, ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলে চলল

— আই অ্যাম সরি ফর এভ্রিথিং। তিন বছর আগে যা ঘটেছে, আর সেদিন যা বলেছি, সব কিছুর জন্য আমি সরি। প্লিজ…

প্রাণ ভরে আনন্দ করতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মুখে বললাম

— ওকে। আমি বলে দেব। আর যেন তোমাকে ডিস্টার্ব না করে।

মনে হল ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল বেচারার। কফি আসল। বললাম

— খেয়ে নাও।

‘না’ বলতে গিয়েও বলল না। ভয়ে। আমি যদি আবার মত পাল্টাই। সেই এমবিএ ভদ্রলোককে কেমন পছন্দ করতে শুরু করলাম। ব্যাটার আসলেই তো বেশ ক্ষমতা। পুলিশ টুলিশেও নিশ্চয় ভালো জানাশোনা। বাট আই মেড আপ মাই মাইন্ড। প্রলয়ের জীবনে কোন সমস্যা ক্রিয়েট করব না। সেদিনের অপমানের প্রতিশোধ নিয়ে ফেলেছি। ওর এই অসহায় চেহারার চেয়ে আর বেশি কিছু চাওয়া আমার নেই।

কফিটা যথা সম্ভব দ্রুত খেয়ে প্রলয় চলে গেল। 

এরপরে, ঠিক যখন আমি ব্যাপারটা মনে মনে এঞ্জয় করছি, তখন এসে হাজির হলেন সেই এমবিএ। আজকে ঠিক সময়ে এসেছে। বোধহয় একটু আগেই বেরিয়েছিলেন, বা জ্যামে পড়েননি। বসতে বসতে বললেন

— থ্যাঙ্ক গড।

— কেন?

— আজ চোখে পানি নেই।

স্মাইল দিলাম বললাম 

— অল বিকজ অফ ইউ। 

— রিয়েলি?

— ইয়া। তবে আজ আপনাকে একটা রিকোয়েস্ট করব।

— মাই প্লেজার। আই থিঙ্ক বিফোর দ্যাট, আই স্যুড অর্ডার সামথিং। কি খাবেন?

এরপরে ভদ্রলোক নিজের গল্প শুরু করলেন। শুনতে থাকলাম। কিছু মাথায় ঢুকল, কিছু ঢুকল না। আমার মনে তখন একটু আগের ঘটনাগুলো ঘুরছে। 

কখন উনি উনার কথা শেষ করেছেন টের পাইনি। হঠাৎ ‘রিকোয়েস্ট’ শব্দটা কানে লাগল 

— কি রিকোয়েস্ট করবেন বলছিলেন?

চিন্তার জগত থেকে এক ধাক্কায় নেমে এলাম। সোহরাব সাহেবের দিকে তাকালাম। চোখে যতোটা সম্ভব অনুনয় এনে বললাম

— প্রলয়কে এখন ছেড়ে দিন।

ভদ্রলোক স্যুপ খাচ্ছিলেন। আমার কথাটা শুনে হাতটা মাঝপথে থেমে গেল। সেই অবস্থাতেই প্রশ্নটা করলেন। টের পেলাম পুরো ক্যাফেটা ঘুরছে।

— কোন প্রলয়?

চলবে

Razia Sultana Jeni

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!