ঝড় হচ্ছে। বর্ষার মৌসুম মাত্রই শুরু হলো, এখনি এতো বৃষ্টি।বারান্দায় দাড়িয়ে বৃষ্টি উপভোগ করছে সজীব।
“চলো আজকে বৃষ্টিতে ভিজবো,তুমি হলুদ পাঞ্জাবি পরবা।
আর আমি নীল শাড়ি পরবো”
এই কথা শুনে সজীব বলল,”প্রিয় লেখক হুমায়ুন স্যারকে Tribute করা হবে মনে হচ্ছে। যাবো কিন্তু তোমাকে এক পায়ে নুপুর পরতে হবে।ওকে?”
“ওকে।আজ সারারাত বৃষ্টি হলে সারারাত ভিজবো আর বৃষ্টি উপভোগ করবো।”
“ওকে।উফ তোমার কথার যন্ত্রণায় বৃষ্টির ছবি তুলতে পারছি না।” সজীব বলল।
হঠাৎ কলিং বেল বাজলো।সজীব ফোন পকেটে রেখে দরজা খুলতে গেল। সজীব দরজা খুলে দেখলো বন্ধু হাসান আর রাকিব।তাদের পরনের গেঞ্জি-প্যান্ট সব ভিজা।”কিরে মামা,কি অবস্থা?”এই বলে ঘরে ঢুকলো রাকিব আর হাসান। “এইতো আছি আরকি” বলল সজীব।”তোর রুমমেট তনয় কই?”জিজ্ঞেস করলো হাসান।”তনয় ওর মামার বাসায় গেছে।””ভালোই হইসে”বলল রাকিব। “যা জামা কাপড় পাল্টা, এগুলোতো ভিজে একাকার। ” বলল সজীব। “হো করতাসি আগে বল কি রাঁধলি?” জিজ্ঞেস করল রাকিব।
“এই খিচুড়ি,ডিম ভাজি আর আলুর ভর্তা। Weather এর সাথে মানানসই।”
“তাইলে তো কথায় নাই পেট ভইরা খামু।এই দুইদিন যে দৌড়ের উপর আছি রে ভাই।” স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল হাসান।
কিছুক্ষন পর খাবার খেতে বসলো তারা তিন জন।”আচ্ছা সাইফুল আসবো না?ওরে একটা ফোন দে।”বলল হাসান।
” ফোন দিসি অনেক বার শালায় ফোন ধরে না।”বলল সজীব।
প্লেটে খিচুড়ি নিতে নিতে রাকিব বলল “মনে হয় আসবো না ও।কালকে ভোরেই মনে হয় আসবো।”
বৃষ্টির দিনে খিচুড়ি ভিন্ন একটা আনন্দ দেয়।
“এইবার কয়দিন আত্মগোপনে থাকবি তোরা?”জিজ্ঞেস করলো সজীব।”গতবারের মতো মাস তিনেক হইলেই হইতো।কিন্তু শালি কেমনে জানি বাইচা গেল।সাইফুলের বাবা তো বলল ছয়-সাত মাস লাগবে।”বলল রাকিব।
“কি জিনিস যে মিস করলি সজীব!পরশুদিন রাতের মেয়েটা, উফ।” দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলল হাসান।
সজীব মুচকি হাসি দিল।
“মেয়েটা সেই সুন্দর ছিলো রে, শরীরটা অনেক নরম ছিলো।তুই যেবার ছিলি ওইটা থেকে গত পরশুদিন রাতে যে মেয়েটাকে ধর্ষন করলাম ও ভালো ছিলো।এতো সুন্দর ছিলো যে মারতে ইচ্ছা করে নাই।তাও তো হাসানে দুইটা ঘুষি দিসে।শালা জানোয়ার।”এই বলে হাসি দিলো রাকিব।”তাইলে তো অনেক মজার কিছু মিস করলাম।” বলল সজীব। হাসান বলল,”আরে বেটা সাইফুলতো মেয়েটার অনেক ছবিও তুলছে ঔ সময়।সাইফুলইতো মেয়েটাকে দেখায়।তারপর আমরা ধরে নিয়ে যাই আমাদের রুমে।”
রাকিব সজীবকে জিজ্ঞেস করলো,”আচ্ছা সজীব, তুই কি আর বাসায় যাস না?”
প্লেটে হাত ধুতে ধুতে জবাব দিলো সজীব,”নাহ।তিন বছর আগের শায়লা গণধর্ষণের পর বাবা আমাকে বাসায় যেতে নিষেধ করছে। মাঝে মধ্যে মা ফোন করে।”
রাকিব বলল,”ও।আচ্ছা তারা সবাই ভালো আছে তো?তোর ছোট বোন গুলা?ওদের সাথে অনেক দিন দেখা হয় না।”
“আছে ভালো।পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত।তনু তো এবার ভার্সিটিতে।’
রাকিব বলল,” সবাই বড় হয়ে গেছে।”
“হ্যা।বাসার সবাই সিলেটে বেড়াতে আসবে।তখন দেখা হবে।এখন সবাই আমার মামার বাসায়।
তখন হাসান বলল,” তোর বাপ মা বেশি করে।আরে ভাই শায়লারে তো মারতে চাই নাই আমরা।নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ছিলো সবাই।”
সজীব বলল,”বাদদে তো।রাতের খাওয়াতো শেষ। রান্না ঘরে পেঁপে কাটায়া রাখসি।গাছ পাকা পেঁপে। “রাকিব বলল, “নিয়া আয় বেটা।”
হাসান বাংলার সিনেমার ভিলেনদের মতো করে বলল,”পরশু রাতে মেয়েটার তিলওয়ালা গালে কামড় দিসিলাম। আজকে পেঁপের টুকরা কামরামু আর ঔ মেয়ে তনিমার গালের কথা মনে করমু।শায়লারেও দিসিলাম। “রাকিব বলল,”তুই শালা একটা জানোয়ার”
এই বলে তিন জন হাসতে লাগলো।
সজীব পাতিলে করে পেঁপে আনলো।এই দেখে হাসান আর রাকিব আরও হাসলো।
সজীব হাসতে হাসতে বলল, “ধুর বাল হাসিস না।রুমে কোনো বাটি নাই এর মধ্যে বড় একটা পেঁপে।
রাকিব বলল,” সজীব তুই পাতিলার ঢাকনা খুলে ধোর,আমরা তিনজন একটা সেল্ফি তুলি।”
তিনজন সেলফি তুলল।
সজীব ঢাকনা তুলে পাতিলা নিচে রাখলো।রাকিব জানালার পাশে দাঁড়িয়ে সজীবকে ছবিটা মেসেঞ্জারে পাঠাচ্ছিলো।হাসান পাতিলার পেঁপে দেখে অবাক।হাসানের কপাল থেকে চিকন ঘাম গড়িয়ে পরছে।হাসান কি করবে বুঝতে পারছে না।রাকিব সেলফিটা পাঠানোর পর সেলফি টায় ভালো করে লক্ষ করলো পাতিলে ওটা পেঁপে না, ঐটা সাইফুলের মাথা।
আস্তে আস্তে কেন জানি রাকিব আর হাসানের হাত পা অবশ হয়ে যাচ্ছে।
পা অনুভব করতে পারতেসে না।রাকিব সজীবকে জিজ্ঞেস করলো,”এইটা কি? এইসব কি হয়তেসে?”
সজীব হাসতে হাসতে বলল,”এইটা পেঁপে , বয় নিচে বলে না পেঁপে খাবি।”
হাসান রেগে বলল,”কুত্তার বাচ্চা”এই বলে সজীবকে মারতে গিয়ে পরে গেল।পায়ে বল পাচ্ছে না।রাকিব ও পড়ে গেল।দুইজনের মাথা ঝিমঝিম করছে।
রাকিব বলল,”এসব কি হইতেসে সজীব? তুই কি করতেসস?”
সজীব এবার হাসি থামিয়ে বলল,”আমার বোনের পুরো নাম কি জানোস?”
হাসান বলল,”কেন তুই জানোস না?”
সজীব বলল,”আমি জানি কিন্তু তোরা জানোস না।তনিমা খানম তনু।চট্টগ্রামে আমার মামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছিল। ঐ খানা একটা পার্কে ঘুরতে গেলো।ওখানের কিছু জানোয়ার ছেলে তাকে ধর্ষন করে।এর মধ্যে একজন ধর্ষক আমাকে ছবি গুলা দেখায়।এবং তার মাথা তোদের সামনে।”এই বলে আবার হাসতে লাগে সজীব। হঠাৎ করে সেন্সলেস হয়ে যায় রাকিব আর হাসান।
সেন্স আসার পর রাকিব দেখলো সে আর হাসান দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে।হাসান মুখ নাড়াতে পারছে না তার সামনের ৬ টা দাত ভেঙ্গে ফেলেছে সজীব,সাথে জিহ্বা ও কেটে দিয়েছে। তাদের দুই জনের হাত পা ভেঙ্গে ফেলেছে সজীব। কোমড়ের নিচে, পায়ে প্রচুর রক্ত।ব্যাথায় কাতর তারা দুই জন।পাশের বিছানায় সাইফুলের মাথা কাটা লাশ।রাকিব অনেক কষ্টে সজীব কে বলল,”দোস্ত আমরা জানতাম না যে ঐ মেয়েটা তনু। জানলে কি আর এরকম করতাম।যা করলি আর আমাদের মাইরা ফেলিস না,তোর পায়ে পরি।আমি সেরেন্ডার করবো।”
সজীব এতোক্ষণ নিজের পিঠে চাবুক দিয়ে বাড়ি দিচ্ছিলো।রাকিবের কথা শুনে তা থামিয়ে রাকিবের সামনে বসলো।
সজীব বলল,”গত তিন বছর আমি অনেক কষ্টে ছিলাম।প্রতি রাতে আমার ঘুম ভেঙে যেত, মনে পরতো শায়লার চিৎকার। প্রথমে বুঝিনি যখন বাবা-মা দূর করে দিলো আমার প্রতিটা রাত ছিলো যন্ত্রণার রাত।মনে হতো শায়লা আমার পাশে।হাসছে, কাঁদছে,কথা বলছে আর ঐ বিকট সুরে চিল্লাচ্ছে। রাত ঘুমাতে পারি নাই একদিন ও।ঘৃণা লগে নিজেকে।আত্মীয় স্বজন , ভালো বন্ধু বান্ধবী সবাই দূরে সরতে লাগলো।একদিন গিয়েছিলাম শায়লার কবর দেখতে।গিয়ে শুনি শায়লার বাবা-মা আত্মাহত্যা করেছে।একটা ভুল তিনটা প্রাণ শেষ।ভয় লাগতো, এখনো লাগে কিভাবে দাড়াবো মহান সৃষ্টিকর্তার সামনে।কষ্টে দিন গুলো যাচ্ছিলো।এরপর আরকি পাপ কাউকে ছাড়ে না,দুনিয়ায় ও এর ফল ভোগ করতে হয়।”রাকিব আর হাসান কাঁদছে।
সজীব বলল,”কিন্তু ভুক্তভোগী আমার বোন হইলো।”
রাকিব কাঁদতে কাঁদতে বলল,”মাফ কইরা দে ভাই জানতাম না তোর বোন ছিলো।আর শাস্তি দিস না ভাই”
সজীব বলল,”ভাই,হা হা।বালের ভাই।ভাই হয়ে কোনো বোনের রক্ষা করতে পারলাম না।তোদের কি শাস্তি দিবো, আমিতো নিজেকে শাস্তি দিচ্ছি।”রাকিব হঠাৎ একটা গন্ধ পেলো।সজীব মুখে সিগারেট নিলো।লাইটার জ্বালালো। সিলেন্ডার ব্লাস্ট হলো।সজীবের গা পুরছে,সে বারান্দায় তাকালো বারান্দায় শায়লা বসা।সজীবের দিকে তাকিয়ে শায়লা হাসছে কিন্তু চোখ দিয়ে পানি পরছে।
শায়লা নীল শাড়ি আর এক পায়ে নুপুর পড়ে বসে আছে। শায়লা কি সজীব এর কষ্ট দেখে কাদছে নাকি শায়লার নিজের কষ্টের কথা মনে পরে গেল যে কষ্টের জন্য দায়ী সজীব নিজেও।কক্সবাজারে শায়লাকে তার ভালোবাসার কথা বলে দেওয়া উচিত ছিল।যদি ভালোইবাসতো তাহলে ধর্ষন করলো কেন সজীব।তাইলে কি ভালোবাসায় খুদছিলো তার।সজীব ভাবলো”আমি কি তাইলে অমানুষ”।তাহলে কেন সকল কষ্ট , ঘৃণা কেন দূর হয়ে যায় শায়লার চেহারা দেখলে।এই যে আগুনে পুড়ছি কিন্তু কষ্ট পাচ্ছিনা।শুধু শায়লার হাসি দেখে।
শায়লা বলল,”কি সজীব চলো বৃষ্টিতে ভিজি, পাঞ্জাবিটা পরো।হলুদটাই পরবা কিন্তু।”রাস্তায় দাড়িয়ে ভিজছে হলুদ সজীব আর নীল শায়লা।
যদি ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব এতোই শক্ত হয় তাহলে কেন তা হেরে যাবে লালসা আর নেশার সামনে।
(সমাপ্তি)
Writer:Meraj Ahmed
What’s your Reaction?
1
3
1
1




