উপলব্ধি


মা জী,আপনার গাড়ি চলে এসেছে।
নার্সের কথায় চমকে গেলেন ফাতেমা বেগম। আজ তাকে হাসপাতাল থেকে সরাসরি বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে। তার নতুন ঠিকানা।তার পুরোনো ঠিকানা , সে নিজ হাতে ধ্বংস করে দিয়েছেন।

কিছুক্ষণ আগে তার বড় নাতি দেখা করে গেলো। এটাই হয়তো শেষ দেখা।জুনায়েদের কথাগুলো এখনও তার কানে ভাসছে

  • দাদি আজ মা কে নিয়ে আমরা আমেরিকায় চলে যাচ্ছি। মাকে এতদিন আপনার জন্য নিতে পারিনি। এখন প্রয়োজন দেখিনা।আপনার সমস্ত অধিকার আপনি নিয়ে নিয়েছেন। ভাববেন না, আপনার থাকা-খাওয়া,চিকিৎসা ব্যয়,আমরা বহন করব।এটা আপনার প্রতি নয়, মার মনের শান্তির জন্য আর আমার মৃত বাবার প্রতি আমাদের দায়িত্ব। আল্লাহ হাফেজ।
    জুনায়েদের চোখে আজ ছিল না আগের মত শ্রদ্ধা ভালোবাসা, ছিল কিছুটা অবজ্ঞা। ফাতেমা বেগম সেই চোখে তাকিয়ে থাকতে পারেননি,ফিরিয়ে নিয়েছেন মুখ। তার বুকটা হু হু করে উঠেছে। আমার জুনায়েদ,আমার জান, আমার সবচেয়ে আদরের নাতি। না এখানে জুনায়েদের কোন দোষ নাই, এটাই আমার প্রাপ্য। ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ান ফাতেমা বেগম। আজ থেকে তার জন্য আর কেউ নেই।

গাড়িতে বসে হঠাৎ মনে পড়ে আকরামের কথা। সাতদিন ধরে সে হাসপাতলে,একটিবারও কোন ফোন করেনি।খোঁজ নেয়নি।এই তার বড় সন্তান, যার জন্য সে জীবন দিতে পারতো।অথচ যার কথা শুনে আজ সে ধ্বংসের মুখে। সবার চোখে সে লোভী, ঘৃণিত।

সে তো খুব ভালোই ছিল তার মেজো ছেলে ইমরানের সংসারে। বৌয়ের সাথে টুকটাক কিছুটা মনোমালিন্য হলেও, আয়েশা তাকে মায়ের মতোই রেখেছিল।তবে ইমরানের বৌয়ের প্রতি অতিরিক্ত ভরসা, ভালোবাসা,মনোযোগ,তাকে কিছুটা বিচলিত করতো। বৌদের এত মাথায় তুলতে নেই। ছেলের এই দূর্বলতার সুযোগে বৌ বাড়িতে কড়াকড়ি নিয়ম, বাচ্চাদের শাসন করে,এসব মোটেও ভালো লাগতোনা ফাতেমা বেগমের।একমাএ নাতনি ইরাকেও ছেলের সমান মানুষ করা, সংসারের কাজ না শিখিয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি করা,এটাও আরো বেশি খারাপ লাগতো।

মুখে আচল গুজে নিঃশব্দে
কেদেঁ উঠলেন। তিনি তো সেদিনই মরে গেছেন,যেদিন তার সামনেই তার ছেলে ইমরানের লাশ আনা হলো। মার জন্য এর চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কি হতে পারে।বলা নেই কওয়া নেই একটা রোড এক্সডেণ্ট,তার ছেলেটা হারিয়ে গেলো।

ইমরান ছিল তার সংসারের মেরুদন্ড। সৎ বাবার ছেলে। কোনরকম খেয়ে পড়ে নিজের পরিশ্রমে আজ এতো ধন সম্পত্তির মালিক।আকরাম বরাবরই বেশি আদরে বিগড়ানো। পড়াশোনা বেশীদূর যায়নি তাই চাকরিও হয়নি। এই ইমরানই নিজের জায়গায় ওর সিমেন্টের গোডাউন টা ভাই কে দিয়েছিল। সেটাও আকরাম ধ্বংস করল। ছোট ভাই পারভেজকে ইঞ্জিনিয়ার বানাতে পেরে ইমরানের সেকি গর্ব। ইমরানের তিন সন্তান ও মানুষের মত মানুষ হয়েছে।

ইমরানের মৃত্যুর পর আকরাম মার প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগী হলো।প্রতিদিনই আসে,মার খোঁজ খবর নেয়। ওর চোখেই প্রথম ধরা পড়ে তার আগের মত যত্ন হচ্ছে না।বউ সারাদিন ঘরে শুয়ে থাকে। ছেলেমেয়েরাও বাবার ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত।
আকরামই তো তার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হলো।
-ছেলে মরে গেলে কি বৌয়ের সংসারে দাম থাকে? ভাইয়ার সম্পত্তিতে আপনার হক আছে আম্মা। এখনই সময় বুঝে নিন,দেরি করলে আর হয়তো দিবে তো নাই, আপনাকেও বের করে দিবে বাসা থেকে।

ঠিকই তো। ফাতেমা বেগম সবাইকে ডেকে যেদিন কথাটি তুলেলেন সেদিন আয়শা একটি কথাও বলেনি।শুধু একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে।জুনায়েদ ও ইরাও অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। জাভেদ একটু রগচটা। ও লাফ দিয়ে উঠে বলেছে
-আমরা কি আপনার কোনো অনাদর করেছি দাদী?

  • এখনো করিসনি। কিন্তু আমার হকটুকু বুঝিয়ে দিতে কি সমস্যা? বাকী জীবন কি তোর মার দয়ায় চলবো নাকি?
    -দাদী আমি সাত দিনের মধ্যে আপনার সম্পত্তি বুঝিয়ে দেবো।তবে শর্ত একটাই,আজ এই মুহূর্ত থেকে আপনার প্রতি আমাদের আর কোন দায়িত্ব নেই আর আপনারও কোন দাবি, অধিকার থাকবে না।

জাভেদ কথা রেখেছে।ফাতেমা বেগম সেদিনই আকরামের বাসায় উঠে আসেন। এতদিন আকরামের যেই বউকে তার নিজের মেয়ে মনে হতো, সেই বৌয়ের ব্যবহার দেখে সে চমকে উঠেছেন। তাকে দেখেই সেই মিস্টি হাসি যেনো উধাও হয়ে গেলো। তিন মাসেই চরম অবহেলা, অযত্ন,অপমান তাকে পৌঁছে দিয়েছে হাসপাতালে দোরগোড়ায়।

ইমরানের থেকে পাওয়া সম্পত্তির অংশ এখন আকরামের দখলে। ছোট ছেলে পারভেজ তো বরাবরই তার থেকে দূরে দূরে। বিয়ে করেছে ব্রিটিশ এক মেয়ে। মাসে মাসে কিছু টাকা পাঠিয়ে তার দায়িত্ব শেষ।

না…ফাতেমা বেগম কাউকে দোষ দেন না। তার এই পরিণতি তিনি নিজ হাতে করেছেন। আজ নিজের প্রতি ধিক্কার আসছে, অতিরিক্ত আদর তিনি এমন সন্তানকে দিয়েছেন, সবসময় যার দোষ লুকিয়ে, অন্যায় আবদার মিটিয়ে গেছেন, তার ফলতো তাকেই ভোগ করতে হবে।আজ তিনি সত্যিকার অর্থে মন থেকে আয়েশার জন্য দোয়া করলেন।এই প্রথম আয়েশার কাছে হেরে তিনি আনন্দ পেলেন।সন্তান শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। আদর,শাসন, সততা,সুশিক্ষা কত জরুরি তা আজ উপলব্ধি করলেন।

উপলব্ধি
কাজী সুরাইয়া নাসরীন সুরভী।

Send private message to author
What’s your Reaction?
0
0
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Kazi Suriya Nasrin Surovi
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!