বৃষ্টির ফোটা

সিলেটের The king bridge এর নিচে সুরমা নদীর বুকে দাড়িয়ে আছে “শিপ রেস্টুরেন্ট “। এখন পড়ন্ত বিকেল।
ছোট্ট “শিপ রেস্টুরেন্টের” ছাদে বসে আছে রিদওয়ান ছোট্ট একটা চেয়ারে। সামনে টেবিল থেকে কফি মগ থেকে ধোয়া উড়ছে। রিদওয়ান অন‍্যমনস্ক হয়ে বসে আছে। কিছু একটা ভাবছে।আগামীকাল সে ইন্দোনেশিয়া যাবে।একদিকে ত খুশি।কিন্তু সে তার মায়ের জন‍্য ভাবছে। মা একা একা কি করে থাকবেন। ভাবতে ভাবতেই মাগরিবের আজান। বিল চুকিয়ে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ল।

খুব ভোরবেলা রিদওয়ান রেডি হলো। তার মা খাদিজা কাদছেন। বাবা মাকে ধমক দিয়ে বললেন, ছেলেটা এখন যাচ্ছে আর তুমি কান্না শুরু করলে?

ছেলের অমঙ্গলের ভয়ে মা কান্না থামালেন।

সাবধানে থাকিস বাবা….বলে মা রিদওয়ান কে আদর করে দিলেন।


সাড়ে আটটায় প্লেন ছাড়বে। অলরেডি তারা পৌছে গেছে। বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইমিগ্রেশন পাস করল।

সময় মতই ইন্দোনেশিয়া পৌছল। তাকে তার বন্ধু রিসিভ করল। আসিফ এখানে কাজ করে। রিদওয়ান কে সেই এখানে আসতে বলে।

পরদিন দুই বন্ধু একসাথে বের হল…..
ইন্দোনেশিয়ার সুন্দর জায়গা গুলো দেখতে লাগল। এখানে রাস্তা পার্ক গুলো দেখে সত‍্যিই সে বিস্মিত।খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। একটা পাতা পড়লেও ভ্রমণকারীরাও তুলে ডাস্টবিনে ফেলে। আর তাকে আকৃষ্ট করে এখানকার মুসলিম কালচার দেখে।……
তো হঠাৎ আসিফের ফোন এলো।জরুরি। রিদওয়ান কে বলল অফিসের বস যেতে বলছে। সে বাসায় চলে যেতে বললে রিদওয়ান বলে, তুই যা দোস্ত, আমি ঘুরি।
আসিফ বলল, পরে বাসা চিনবি তো?

আরে এখান থেকে আর কতদূরই বা হবে। ঠিকিই চিনব।

তো আসিফ চলে যাবার পর রিদওয়ান একটা মসজিদে ঢুকল। খুব সুন্দর কারুকাজ করা। আরেকটা কারণ হলো আজান হয়েছে।……….

নামাজ শেষে সে রাস্তা দিয়ে হাটতে লাগল। হঠাৎ একটা পালর্স দেখল।মেয়েদের ছোট্ট পালর্স দেখে বুঝল।খুলে দেখল বেশকিছু কাগজপত্র।কিন্তু সে ঘাটাঘাটি করলনা। ভাবল স্থানীয় কোনো থানায় দিয়ে আসবে।
ইতিমধ্যে একটা মেয়েকে দেখল।ভাবভঙ্গি দেখে তার মনে হলো কিছুএকটা খুজছে। সে গিয়ে জিঙ্গেস করল ইংরেজি তে।
মেয়েটা প্রথম তার দিকে তাকাল।মেয়েটি হিজাব পড়ে। মেয়েটি তার কথার ধরন দেখে বুঝল সে বাঙালি। আসলে মেয়েটিও বাঙালি।তবে সে ছোট থেকেই ইন্দোনেশিয়ায় থাকে বাবা মার সাথে।মেয়েটি বলল, আমি বাঙালি। আপনি বাংলাতে কথা বলতে পারেন।

রিদওয়ানের ভালোই লাগল।কারণ একজন বাঙালির দেখা পেল এতক্ষণে।সে বলল, কিছু কি খুজছেন?

মেয়েটি বলল, আমার একটা ছোট্ট ব‍্যাগ। ওতে অনেক দরকারি কাগজপত্র রয়েছে।

রিদওয়ান তার হাতের ব‍্যাগটা দেখিয়ে বলল, এটা কি?
ও…. আলহামদুলিল্লাহ্। ধন‍্যবাদ আপনাকে।এটা না পেলে অনেক বিপদে পড়তাম।

রিদওয়ান নিজের পরিচয় দিয়ে হ‍্যান্ডশেখের জন‍্য হাত বাড়িয়ে দিল।মেয়েটি হাতের দিকে চেয়ে ইতস্তত করল। বলল, আমার নাম ফাতিহা।কিন্তু হাত মেলালো না। রিদওয়ান বুঝল সংস্কারী মেয়ে। সে হাতটা সরিয়ে নিল। তারপর মেয়েটা আরো একবার আন্তরিকভাবে ধন‍্যবাদ জানিয়ে চলে গেল।

রিদওয়ানের ইচ্ছে ছিল মেয়েটার সাথে কথা বলতে। কিন্তু হলো না।

রাতে খাবার খেতে দুইবন্ধু গল্প করল।কথায় কথায় রিদওয়ান ফাতিহার কথা বলল। আসিফ মুচকি হেসে বলল, কি বন্ধু ভালো লেগেছে নাকি? আন্টিকে বলব আমাদের রিদওয়ান পাত্রী পছন্দ করেছে? বলে সে হাসতে লাগল।

রিদওয়ান বলল, ধুর। তুই না একটা….?

হুমমম….সত‍্য কথা ভাত নাই। ভালো ভালো।তা বন্ধু ভালো লাগল বলে ফেলিস। তোর ভালোই হবে।
রিদওয়ান তার মাথা চাটি মারল।


পর দিন তারা দুজন ঐদিকেই গেল। যেখানে মেয়েটার সাথে দেখা হলো। আসলে আসিফ জোর করেই নিয়ে এলো। কিন্তু দেখা পায়নি। পাবে কি করে মেয়েটা তো তাদের জন‍্য অপেক্ষা করছে না।

বেশকিছুদিন কেটে গেল।হঠাৎ ঐ মেয়েটার সাথে দেখা হলো। রিদওয়ান নিজ থেকেই ফাতিহার কাছে গেল। ভালোমন্দ জিঙ্গেস করল। ঐদিন অনেক কথাই বলল তারা। মেয়েটার একটা চাকরি দরকার।আসিফ বলল, যদি আপনি আর্টিকেল রাইটার হিসেবে চাকরি করেন তাহলে আমাদের অফিসে কাজ করতে পারেন।
ফাতিহা রাজি হলো। রিদওয়ান ও এই কাজ জয়েন করেছে অলরেডি।বন্ধুর কথাতেই। কারণ অনেক কিছু জানা প্রয়োজন হয় এসব লিখতে হলো। এটার ফলে সে ঘুরতেও পারবে এখানের অনেক জায়গায়।

কিছু দিন পর ফাতিহা জয়েন হলো। রিদওয়ান আর ফাতিহা কাজের জন‍্য অনেক জায়গাই ঘুরে। ফাতিহা অনেক জায়গা ই চিনে।ফলে গাইডের প্রয়োজন নেই।

এভাবে আস্তে আস্তে রিদওয়ান ফাতিহার প্রতি দুর্বলতা অনুভব করে।কিন্তু কিছু বলেনি। তারা দুজন বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেল। অনেক কিছুই শেয়ার করে। জানতে পারল ফাতিহা কারো সাথে সম্পর্কে জড়ায়নি।এতে সে খুশি হলো।
এভাবেই কাটছিল…..

কিন্তু একদিন ফোন আসল রিদওয়ানের মায়ের খুব অসুখ।তাই রিদওয়ান বাংলাদেশে চলে গেল তাড়াতাড়ি করে ঐদিনই।ফলে ফাতিহা কে জানাতে পারলনা।………

অনেকদিন হলো বাংলাদেশে সে।ফাতিহার সাথে যোগাযোগ নেই। ফাতিহার কোনো ফেসবুক আইডি এসব ছিলনা।

রিদওয়ান একদিন কাছ থেকে জানতে পারে যে ফাতিহা অনেক আগেই কাজ ছেড়ে দিয়েছে।আর তার বিয়ে হয়ে গিয়েছে।কিন্তু আসিফ যায়নি। একথা শুনে রিদওয়ান অনেকটাই ভেঙ্গে পড়ে। কারণ সে ফাতিহাকে ভালোবেসে ফেলেছিল। কিন্তু নিয়তি তার সঙ্গ দেয়নি।……..

অনেকদিন পরে সেই শিপ রেস্টুরেন্টে বসে আছে। হঠাৎ তার মনে হল ইমেইল অনেকদিন চেক করা হয় নি। তাই সে ইমেইল চেক করতে গিয়ে ফাতিহার মেইল পেল। তার হাত কাপতে থাকে। মেইল টা দুমাস আগে এসেছে। কাপা হাতে সে মেইলে ক্লিক করল।ফাতিহা লিখেছিল,” কেউ একজন আপনার অপেক্ষা করছে।হয়ত আপনি জানেননা। “

রিদওয়ান বুঝতে বাকি থাকল না। কিন্তু সে এখন কি করবে।মেইলটা ত দুমাস আগে।কিন্তু কদিন আগেই তো তার বিয়ে হয়ে গেল। সে কাদতে থাকল। তার জীবনের সবচেয়ে বড় একটা জিনিস সে হারালো নিজের ভুলেই। নীরবে চোখের বৃষ্টি ফোটা পড়তে থাকল। কেউ দেখে ফেলবে এজন‍্য সে তাড়াতাড়ি ঐখান থেকে চলে এলো।
পেয়েও মানুষ যা হারায় তার বেদনা সহজে যায় না। মনের দাবানল কে চোখের ঐ বৃষ্টিও নেভাতে পারেনা
…………………………………..

আজ আসিফ আসবে। এয়ারপোর্টে রিদওয়ান দাড়িয়ে আছে। ছুটি নিয়ে এসেছে। অনেকদিন যাবত দেশে আসে না।জানে রিদওয়ান অনেকটাই ভেঙ্গে পড়েছে। তাই তার সঙ্গও দেয়া যাবে।
মেঘলা আকাশ। রিদওয়ান বাইরে দাড়িয়ে। এখনি এসে পড়বে আসিফ। বৃষ্টির ফোটা পড়তে শুরু করেছে। সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই। তার মন ভালো না। মেঘলা আকাশ দেখে মনটা কেমন কেমন করছে।

আসিফ বাইরে রিদওয়ান কে দেখে ডাকল। দৌড়ে গিয়ে বন্ধু কে জড়িয়ে ধরল। বলল, কিরে তর এই অবস্থা? কি হয়েছে তর? এখনো ঠিক হতে পারিসনি? যে যাবার সে…..

তাকে শেষ করতে না দিয়ে রিদওয়ান বলল,থাক এসব। বাড়ি চল।

গাড়ির দিকে হাটতে থাকল……..

আসসালামু আলাইকুম……..

রিদওয়ানের মনে বিদ‍্যুৎ খেলে গেল। অতি পরিচিত এই কন্ঠ। পিছন ফিরে ঘুরতেই দেখল সেই হিজাবী, সংস্কারী, ভদ্র সুশীল মেয়েটা।ফাতিহা।
যে তার জন‍্যে অপেক্ষা করছে বলেছিল।
রিদওয়ানের চোখে পানি এসে গেল। নিজেকে সামলে বলল, তুমি?
কথা যেন আসতেই চায়না। এতই দুর্বল কন্ঠ।

ফাতিহা বলল, আপনার জন‍্যে অপেক্ষা করে থাকা মেয়েটা। বলে কাদতে লাগল।

কিন্তু তুমার তো?

হয়নি…… তুমার জন‍্যে অপেক্ষা করছি এখনও।
ফাতিহা বাবা মার সাথে এসেছে। বাবা জানার পর মেয়েকে নিয়ে এসেছেন।
………

দুজন দাঁড়িয়ে অশ্রু ফেলছে। কিন্তু সেই অশ্রু বৃষ্টির ফোটার সাথে মিশে গেছে।…………

লেখক : সাইফুল ইসলাম রবিন ( Saiful Islam Robin )

Send private message to author
What’s your Reaction?
2
7
0
0
0
0
0
Share:FacebookX
Avatar photo
Written by
Saiful Islam Robin
3 1 vote
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

Locbook Platform

Locbook is an independent platform for aspiring writers

error: Content is protected !!