সময় পেরিয়ে যায় দ্রুত। স্মৃতিময় শিশুকাল, উদ্দীপ্ত দুরন্ত কৈশোর আর যাপিত যৌবন পেরিয়ে আজমল সাহেবের বয়স আজ ৫৫।
মনে হয় এই সেদিনই তো দেশপ্রেমের এক অদম্য আর সুপ্ত বাসনা নিয়ে সামরিক বাহিনীতে যোগদান আর আজ ভাবেন কেমন জানি অতি দ্রুত জীবন থেকে তিরিশ টি বছর পেরিয়ে গেলো। তাঁর স্মৃতির অ্যালবাম থেকে পাতাগুলো দ্রুত উল্টোতে থাকে আর আজমল সাহেব ভাবেন “তবু যেন মনে হয় সেদিন সকাল”। হঠাৎ ভাবনায় ছেদ পড়ে আর ভাবে এটাই তো বাস্তবতা।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আজমল সাহেব আজ নিয়ত স্বপ্নের জাল বুনেন আগামী দিনের স্বপ্নের আবাসন “জলসিড়ি” নিয়ে। কতো ভাবনা, এলোমেলো ভাবনা আর স্বপ্ন এটাকে ঘিরে। স্ত্রীর সাথে প্রায়ই় আলোচনা করেন কেমন হবে তাদের স্বপ্নের বাড়ি, কতটুকু খোলা জায়গা থাকবে, ফুলের বাগান টা কেমন হবে, ছাদটা কেমন হবে, কি কি গাছে সাজানো থাকবে ছাদ বাগান, দক্ষিণের বারান্দা কেমন হবে এরকম আরো নানান ভাবনা। বাঁধন আর রিক্ত মনোযোগ দিয়ে শুনে বাবা মায়ের সেই স্বপ্নের জাল বোনার আলাপন। আর একসময় তাদের মনেও জলসিড়ি কে নিয়ে আগামীর স্বপ্ন উঁকিঝুঁকি মারতে থাকে। রিক্ত বলে উঠে বাবা ঘরের কোণে আমি কয়েকটি পাখি পুষবো। আমি প্রতিদিন পাখিকে খাওয়াবো, গোসল করাবো আর তাদের সাথে খেলা করব। সাথে সাথে বাঁধন বলে উঠে আমার শোবার ঘরে থাকবে অনেকগুলো একুরিয়াম। আর আমি দেশ বিদেশ থেকে অনেক সুন্দর সুন্দর মাছ সংগ্রহ করে সেখানে পুষবো। নিজেদের আর বাচ্চাদের স্বপ্নগুলো হিসাব করতে করতে একসময় আজমল সাহেব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন।
অনেকদিন হয় ভাবেন নিজের এ একখণ্ড স্বপ্ন দেখতে যাবেন সবাইকে নিয়ে। আজমল সাহেবের বাবা-মাও বায়না ধরেন তাদের সাথে ভবিষ্যৎ স্বপ্নের আবাসন দেখতে যাবেন। কল্পনায় দেখবেন ছেলে, ছেলে বউ আর নাতি-নাতনিদের হাস্যময় পদচারণা, ছুটোছুটি, ব্যস্ততা আর আনন্দঘন প্রতিটি মুহূর্ত।
সবাইকে নিয়ে আজ বিকেলেই ঘুরে এসেছেন স্বপ্নের আবাসন জলসিড়ি। মনে পড়ে যখনই জলসিড়ির কার্যালয়ে গেছেন সেখানে কর্মরত সবার প্রচন্ড এক আন্তরিকতার কথা। কোনদিন চা না খেয়ে উঠে আসতে পারেন নি সেখান থেকে। মনে হচ্ছিলো নিজের বাসায় ড্রয়িং রুমে বসে সবার সাথে খোশগল্প করে সময় পার করছেন। দেখেছেন সবার মধ্যে এক প্রচণ্ড কর্মব্যস্ততা। কেমন করে কত তাড়াতাড়ি এ স্বপ্নের বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা যায়। সিনিয়র,জুনিয়র আর নিজের কোর্সমেট ও কাজ করেছেন এ প্রকল্পে। কিন্তু যখনই যার কাছে গেছেন সবার কাছ থেকেই পেয়েছেন আন্তরিকতার এক উষ্ণ পরশ। তাদের কথা ভাবতে ভাবতে শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে আজমল সাহেবের।
সন্ধ্যা আসে আসে। গোধূলির আলো ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে আসে। আজ বিকেলেই ঘুরে এসেছেন স্বপ্নের জলসিড়ি। বারান্দায় এসে বসেন আজমল সাহেব। ভাবতে ভাবতে আবার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। কল্পনায় ভাবতে থাকেন আগামী দিনগুলো কেমন যাবে স্বপ্নের সেই আবাসনে। ভাবেন সফেদ পাঞ্জাবি পড়ে দল বেঁধে মসজিদে যাবেন, সকালে দেখা হবে অনেকের সাথে প্রাতঃকালীন হাঁটার সময়, বারান্দায় বসে হঠাৎ সামনে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া কোর্সমেট কে তুই বলে ডেকে উঠবেন, অনেকদিন পর কারো সাথে হঠাৎ হয়তো দেখা হয়ে যাবে কাঁচাবাজারে, সন্ধ্যার পর হেঁটে হেঁটে বেড়াতে যাবেন সতীর্থদের বাসায়। মাঝে মাঝে আবার হয়তো শুনবেন কারে কারো চির বিদায়ের কথা। এও ভাবেন ৩০ বছর আগের সেই টগবগে তরুন কতটা পথ পেরিয়ে আজ বার্ধক্যের দোরগোড়ায়।
এলোমেলো সব ভাবনা একের পর এক স্মৃতিপটে ভাসতে থাকে আজমল সাহেবের। ভাবেন জীবনটাই এমন “শুধু আসা যাওয়া, শুধু স্রোতে ভাসা”।
রাত ক্রমশ গভীর হয়ে আসে। দুরের মসজিদে এশার আযানের ধ্বনি ভেসে আসে। ভাবনায় ছেদ পড়ে আজমল সাহেবের। স্মৃতিগুলো মনিকোঠায় ধারণ করেই উঠে দাঁড়ান আজমল সাহেব।
(নোট : জলসিড়ি আবাসিক এলাকা সশস্ত্র বাহিনীর অফিসারদের জন্য পূর্বাচল এলাকায় একটি পরিকল্পিত আবাসন)।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
Md. Aowrangazeb Chowdhury






