“আজ ১লা আষাঢ়, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, বাইরের আবারও ভারী বর্ষণ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষন আমি বসেছিলাম, এক পুরনো বাস স্টপেজের ভাঙ্গা বেঞ্চিতে। বৃষ্টি শুরু হবার দরুন সেখানে লোকসমাগম বেড়েছে। এক বাদাম বিক্রেতাও এসে পড়ল সেখানে। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, হরেক রকম মানুষের হরেক রকমের বৃষ্টি বন্দনা। ছাউনির একেবারে বাইরের দিকে দুজন স্কুল পড়ুয়া বালক-বালিকাকে দেখছি, খুব সম্ভবত বালিকাটি বৃষ্টিতে ভিজতে চাচ্ছে। আর বালকটি বারবার বারণ করছে। কিশোরী তাতে গাল ফুলিয়ে অভিমান করে বসেছে। তাদের অমন মধুর মান-অভিমানের পর্ব দূর থেকে নীরব দর্শকের মত লক্ষ্য করে যাচ্ছি। সাথে সাথে, মস্তিকের নিউরন সেলের লাইব্রেরী হাতড়ে বেড়াচ্ছি। কী যেন খুঁজে চলছি, মনের অজান্তেই হঠ্যাৎ করে এত মানুষের ভীড়ে নিজেকে ভীষণ একাকী মনে হলো। মনে হল, আমি আজন্ম একাকী জীবন পাড়ি দিতে গিয়ে আজ অনেক ক্লান্ত পরিশ্রান্ত এক জীবন যোদ্ধা। আমারও কারো আপন হতে ইচ্ছে হয়, আমারও মনে লয় কেউ আমার জন্যে প্রতীক্ষায় থাকুক। আমারও ইচ্ছে করে, কারো সাথে ইন্দ্রলোকে বসে সীমাহীন গগনে চন্দ্রিমার দিগ্বিজয়ি রূপালী উৎসব দেখব। কিন্তু কার সাথে দেখব? এমন কেউ কী কখনো কোনো কালে ছিলো আমার? ছিল। খানিকক্ষণ আগে, সে আমার থেকে যোজন যোজন দূরে অজানা দেশে পাড়ি জমিয়েছে। এখন সে, আর আমার কথা ভেবে মিছে চোখের জল ফেলে না। কেনই বা ফেলবে? এখন যে সে অন্যকারো পত্নী। অথচ, একসময়… কেমন পাগলামী না করত?
মনে পড়ে, এমনি এক বিকেলে দু’জন স্কুল থেকে বাড়ী ফিরছি। আচমকা আকাশ ভেঙ্গে বর্ষা ক্রদন শুরু হয়ে গেলো। দৌড়ে দু’জনে ভাঙ্গা বাড়ীর বেলকুনিতে আশ্রয় নিলাম। তবুও দুজনে ই অনেকখানি ভিজে গিয়েছিলাম। মাথা ঝাড়তে ঝাড়তে একবার উপরে তাকিয়ে দেখি সমগ্র আকাশ বিদ্যুতের লীলাখেলা মত্ত। ভারী গর্জন হচ্ছে। মনে হল, বুকের ভেতর কে যেন বিমর্শ ভাবে শব্দ করে যাচ্ছে। ডানে ঘাড় ঘুড়িয়ে মাধাবীর দিকে তাকিয়ে দেখি সে ভয়ে কুঁকড়ে যাচ্ছে। তখন পর্যন্ত আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম। একটিবারের জন্যে মনে হয়নি, আমার অবুজ মন এক মনে তাকে ভালোবাসে। তখন কী আর সে সব বুঝবার বয়স? আমি মাধাবীর কাছে এগিয়ে গেলাম। সে মাথা নিচু করে কাঁপছে, আমি যে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছি সেটা লক্ষ্য করে নি সে। দু’হাত দিয়ে আমি তার হাত দুটি ধরলাম। মাধবী চমকে গেল। আমি বললাম, “ভয় পাচ্ছ?” মাধবী, কিছু বলল না। আবারও আমি বললাম, “আমি তো আছি নাকি?” মাধবী মাথা তুলে একবার আমার দিকে তাকালো। আমিও তার চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকা আমার পূর্ণতার বোধয় প্রথম দেখা পেয়েছিলাম। কেমন করে যে সময় চলে গেল, বুঝে উঠতে পারলাম না। মেঘের গর্জন কমে কখন যে অবিরাম বারিপাত শুরু হয়েছে বলতে পারি না। আমি তাকিয়ে ওর চোখের ভাষা পড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছি, সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তারপর, হুট করে তার হাত দুটুকে বন্ধন মুক্ত করে নিল। মাটিতে রাখা ব্যাগ তুলে নিয়ে, বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে বাইরে তাকিয়ে রইল। এমন নিতান্তই ছেলে-মানুষী কর্ম-কান্ডে ভীষণ লজ্জা হলো আমার। দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে, মনে মনে নিজেকে দোষারোপ করতে লাগলাম। দ্বিতীয়বার ওর দিকে তাকানোর সাহস হলো না। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি আমাদের বন্ধুত্বটাকে আমি গলা টিপে হত্যা করে দিলাম। আর কোনোদিনো বোধয় সে আমার সাথে স্কুলে যাবে না, কথা বলবে না, মুখের দিকে তাকিয়েও দেখবে না। অপরাধ বোধটা ক্রমশই বাড়তে লাগল। সেদিকে বৃষ্টির ধারাও কমবার নাম-গন্ধ নেই। উপায়ন্তর না দেখে, আমি মাধবীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালাম। দেখতে পেলাম, সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। তার ভাবনায় কী ছেদ দেব কী দেব না ভাবতে ভাবতে, সে মাথা এমনভাবে ঘুড়িয়ে নিল যে, আমার চেহারাটা পর্যন্ত দেখবার কোনো ইচ্ছে নেই তার মনে। এটা মনে হতেই একরাশ ভারী অভিমান জমে গেল মনে। কাঁধের ব্যাগ ফেলে, আমি নেমে পড়লাম রাস্তায়। মুষল ধাঁরে বৃষ্টিতে ভিজে চলেছি, নিজের করা নিজের উপর এক বুক অভিমান নিয়ে। মাধবী ডাকল, “এই! তুমি ওখানে কেন? এখানে এসো।” আমি ঘুরে দাঁড়ালাম যেন ওর কোনো কথাই আমার কানে না আসে। মাধবী ব্যাকুল হয়ে ডাকল,”সূচক! আমার কথা শোন। এদিকে এসো। শোন ই না।” ইশ্ সেই মিষ্টি কণ্ঠের কুল হারানো মায়াবী ডাক! অভিমানটা পড়ে গেল, তবুও আমি বেলকুনিতে এলাম না। ঠায় দাড়িয়ে রইলাম। যেন এবার ঈশ্বরের উপর অভিমান জন্মেছে আমার! মাধবী ব্যাকুল হয়ে ডেকে চলল, “আরও ভিজলে জ্বর আসবে যে!” আমি নড়লাম না। এবার আর মাধবী নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নিজে এসে ঐ নরম হাততে আমার নিঠুর হাত ধরে বেলকুনীতে নিয়ে গেল। রাগী রাগী গলায় বলল, “কী ভেবেছ তুমি নিজেকে, হ্যাঁ? যা মনে আসবে তাই করবে? কেন, আমার কোন কিছু বলবার অধিকার নেই?” আমি কিছু বললাম না, মাথা নিচু করে দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাঁপছি; মনে হচ্ছে, জ্বর এই এলো বুঝি। মাধবী এক মনে বলে যাচ্ছে, ওর কোনো কথাই এখন আর কানে ডুকছে না। চিকন হুইসেল কানে বেজে চলেছে তখন। আমি ডান কানে আঙুল দিয়ে আলতো করে নাড়া দিলাম। না, থামছে না। হুইসেল বেড়েই চলেছে। সেদিকে মাধবী কখন যে চুপ করে গেছে জানি না। আমার একেবারে কাছাকাছি এসে মমতাময়ী ভাবে, আমার কপোলেতে হাত দিল।
“তোমার গা দিয়ে দেখি আগুন বের হচ্ছে”, বিচলিত হয়ে সে বলল। আমি মৃদু হাসলাম। তারপর আর কিছু তেমন ভাবে মনে নেই। আবছা আবছা মনে পড়ে, নতুনদা বোধয় কাঁধে করে বাড়ী নিয়ে এসেছিলো আমায়। তিনদিন অচেতন ছিলাম। সময় সময় মাধবী এসে আমাকে দেখে গেছে শুনেছিলাম ছোটপার মুখে। মুচকি হাঁসি দিয়ে ছোটপা সেদিন জিজ্ঞাস করেছিলো, “কী রে ছোটন! ব্যাপারটা কী বল দেখি।” আমি হেঁসে উড়িয়ে দিয়ে বলি, “নাহ্, কি যে বলো না, ছোটপা!” ছোটপা সত্যি সত্যি কেমন করে আমাদের অন্তরের আকুলতা টের পেয়ে গিয়েছিল তা আজও ভেবে পাই না। তবে হ্যাঁ, সেই কাক-ভেজা বিকেলে আমরা আমাদের অন্তরে একে অপরের অস্তিতের সন্ধান হয়তো পেয়েছিলাম। যার জন্যে, ঐ অমূল্য ভালোবাসার প্রথম স্পন্দন টের পেয়েছিলাম, প্রথমবারের মতন দুজনের ই মনঃমাঝারে।
কিন্তু বিধিবাম। সেটা আর সেই পূর্ণতা পায় নি। বাস্তবে ফিরে এলাম। তখন, ঠিক আমার সামনেই বাদাম বিক্রেতা দাড়িয়ে আছে। ৫০ গ্রাম বাদাম কিনে ফেলি। শুষ্ক মুখেই বাদাম চিবুনো শুরু করি। বাদাম চিবুতে চিবুতে নজরে পড়ল, ঠিক আমার ডান পাশে শাড়ী পড়া একজন তরুনী। অনেকক্ষণ ধরে আমারে দিকে তাকিয়ে ছিলো সেটা নজরে আসে নি এতক্ষন। পঞ্চইন্দ্রিয় আমাকে সজাক করে তুলে। ঘোর কেটে বাস্তবের দুনিয়ায় ফিরতে ফিরতে যে এমন এক শ্যামা নয়নমোহনী আমাকে দেখে মুখ টিপে টিপে হাঁসতে থাকবে ভুলেও স্বপ্নে ভাবি নি। আমি তাকাতে ই উনি মুখ ঘুড়িয়ে নিচ্ছিলেন। আমি যে কিছু বলব, তাও ভেবে পাচ্ছিলাম না। আপাদমস্তক আরেকবার ঠিক করে দেখে নিলাম তাকে। পড়নে হালকা গোলাপী রঙের শাড়ী, সাথে ছোট্ট একটা ব্যাগ, কাজল রাঙ্গা চোখ, কপোলে রাখা ঈষৎ শাদা টিপটা বৃষ্টিতে ভিজে খানিকটা সরে গেছে। অনেক ভেবে বিষয়টা এড়িয়ে গেলাম। মনে মনে বললুম, থাক এ যাত্রায় তাকে নাহয় কিছু না ই বললাম।
কিন্তু কে জানে, বিধাতা সেই বৃষ্টিস্নাত বিকেলে আমার ভাঙ্গা মনে আকুল করে ডাকা প্রার্থনার জবাব এমন করে দিবেন। কে জানে, দু’জনার গন্তব্য হবে এক বাস দিয়ে এক স্টেশনের এক ট্রেনে। আবার ঠিক বাসে তার পাশের সীটে আমার ই বসা হবে। আর কে ই বা জানত, গল্প করতে করতে একসময় আমি ঠিক তার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে যাব। অথচ, সে আট-দশজনের মত করে আমাকে গণপিটুনির দেবার অভিপ্রায় করবে না। এ যেন বিধাতার দেয়া আমার জীবনের নব সূচনার নতুন আহ্বান!”
– সূচক
Send private message to author


