ষাট, সত্তর দশক বা তারো কিছু আগের কথা বলছি। সমাজ তখন তত অগ্রসর ছিল না। সে সময় আজকের মত আয় বৈষম্য এত তীব্র ছিল না। অভাব তখন তেমন ছিল না, ছিলো না বিলাসীতার ও তেমন বাহুল্য। সমাজ তখন মুলত ছিল গ্রামকেন্দ্রীক। সে সময়ে নগরায়ন ছিল খুব সীমিত পর্যায়ে। শতকরা ৯০ ভাগ লোকই বাস করতেন গ্রামে।
মানুষের জীবনযাত্রা ছিল অত্যন্ত সহজ সরল। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা আর দরদ ছিলো প্রশ্নাতীত। তখন বেশীর ভাগ পরিবারই ছিল মধ্যবিত্ত আর নিম্ন মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্তের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। গ্রামীণ জনপদের অনেকেরই প্রাচুর্য ছিলনা, ছিলনা বিলাসী জীবন যাপন ও। সবারই আন্তরিক চেষ্টা থাকতো আয় অনুযায়ী খরচ করতে। শর্টকাট ভাবে বড় লোক হওয়ার তেমন কোন সুযোগ ছিল না তখন। মানুষের ছিল অল্প আর তাতেই সন্তুষ্ট থাকতো তারা।
সে আমলে মানুষের টানা পোড়নের মধ্যে ও মানুষের প্রতি মানুষের সহায়তা প্রদানের আন্তরিক প্রচেষ্টা আর প্রথার ব্যাপ্তি ছিল বিশাল। একজনের জিনিস অন্য জনেরা প্রয়োজনে শেয়ার করতেন। আর তখনকার সমাজে এই শেয়ার করার প্রথা ব্যাপক ভাবে প্রচলিত ছিল। আর মানুষ সেটা করতো হাসি মুখে, অত্যন্ত খুশী মনে আর আনন্দের সাথে।
পরিবার গুলোতে তখন দেখতাম একই ক্লাসে পড়া ভাই বোন এক সেট বই দুজনে শেয়ার করতে। একজনের ভালো জামা কাপড়, জুতা সেন্ডেল বা অন্যান্য সামগ্রী প্রয়োজনে শেয়ার করতো পরিবারের অন্য সদস্যরা। এই শেয়ার করা শুধুমাত্র পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রয়োজনে পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধু বান্ধব, বা অন্যদের সাথে ও শেয়ার করা হতো এই জিনিস গুলো। এই শেয়ার করার মাধ্যমে সে সময় লোকজন ব্যাপক আনন্দ ও পেত।
যদি পরিবার গুলোর কথা বলি তখন পরিবার গুলোর সম্পদ ছিলো সীমিত। কিন্তু ছিলো পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে শেয়ার করার এক সুন্দর আর পরিচ্ছন্ন মানসিকতা। সে সময় গড়ে এক একটি পরিবারের ছেলে মেয়ের সংখ্যা ছিলো ৫/৬ জন। কোন কোন ক্ষেত্রে তারো বেশী। তুলনামূলক ভাবে একটি বড় পরিবার। বাড়ীতে পালা হাঁস মুরগী থেকে কিছু ডিম পাওয়া যেত, পাওয়া যেত গরুর দুধ। সেগুলো প্রচুর পরিমাণে না থাকায় তখনকার মায়েরা এগুলো ভাগ করে দিতেন ছেলে মেয়েদের মধ্যে। তাই সব সময় সবার ভাগ্যে এগুলো সমান ভাগে জুটতো না। তারপর ও সীমিত এই সব সামগ্রী শেয়ার করে সবাই তুষ্ট থাকতো।
একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন বাড়ীর পেয়ারা গাছে একটি পেয়ারা পেকে লাল হয়ে আছে। হঠাৎ সেটা বড় কারো নজর পড়লো। গাছ থেকে সেটা পেড়ে নিয়ে আসা হল। মা বা বাবা তখন সেটা ৪ বা ৫ টুকরো করে এক একটি টুকরো খেতে দিলেন প্রত্যেককে। সবাই তাতেই খুশী।
সেই সময়ে আজকের মত বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কম্পিউটার ট্যাবলেট, স্মার্ট ফোন, দল বেঁধে বাইরে খেতে যাওয়া, সিনেমা দেখা এই রকম বিনোদন ছিলো না। কিন্তু তারপরও এই বিশাল গ্রামীণ জনপদের মানুষের আনন্দের কোনো সীমা পরিসীমা ছিলো না। ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা দলবদ্ধ ভাবে পুকুরে সাঁতার কাটতো, আত্মীয় স্বজনদের বাড়ীতে বেড়াতে যেতো, বিকালে বাড়ীর পাশে পতিত জমিতে দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, হা ডু ডু, মার্বেল খেলতো, দল বেঁধে গাছে উঠে আম জাম পেরে খেতো, নদী, নালা, খাল, বিল আর পুকুরে মাছ ধরা সহ এই জাতীয় আরো অনেক কিছুতেই মেতে উঠতো তারা। মেয়েরা ওপেন্টি বাইস্কোপ, চোর পুলিশ, এক্কাদোক্কা, গুটি, কুতকুত এই সব খেলায় মেতে উঠতো বাড়ির আঙ্গিনায়। এই সমস্ত খেলা ধুলা আর আনন্দের উপকরণে ছিলনা কোন খরচের বালাই। কিন্তু এগুলোতেই নির্মল এক আনন্দে ভরে যেতো তখন তাদের মন। বাড়ীতে মামা, খালা, ফুফু, নানী বা অন্য কোন মেহমান আসলে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের আনন্দের কোন সীমা পরিসীমা থাকতো না। সে সময় ছোটদের আনন্দের বড় একটি উৎস ছিল প্রকৃতি, পরিবেশ, সমাজ, পরিজন আর পরিবার।
আজকাল আমাদের প্রাচুর্য বেড়েছে। মানুষের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসের পরিমাণ বেড়েছে। বিনোদন আর আনন্দের হাজারো উৎস আজ চারিদিকে। কিন্তু সেদিনের সেই আনন্দ কি আছে আজকের প্রজন্মের? আত্মকেন্দ্রিকতা কি ধীরে ধীরে গ্রাস করছে বর্তমান প্রজন্মকে? আজকের প্রজন্মের এত প্রাচুর্য, এত প্রাপ্তির মধ্যে ও কোথাও যেন বিশাল এক শূন্যতা লুকিয়ে আছে, আছে দৃশ্যমান এক আনন্দের ঘাটতি আর অপ্রাপ্তির এক সূক্ষ্ম বেদনা।
কিছু গানের লাইন মনে পড়ছে আজ,
হেমন্তের গানে,
“মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে”।
বাউল সাধক শাহ আব্দুল করিমের গানে,
“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম”।
মোঃ আওরঙ্গজেব চৌধুরী।
টরন্টো, কানাডা।
১৫ নভেম্বর ২০২১।




