ভোরের আলো আঁধারীর মাঝেই ঘুম থেকে জাগা অভ্যেস নাজমার। শীত বা গ্রীষ্ম যাই হোক না কেন নিয়মের হেরফের নেই একটুও। ঘর থেকে বেরিয়ে টানা বারান্দার ক’ ধাপ পেরুলেই সবুজ গাছ গাছালিতে ঘেরা উঠোনটাকে খুব ভালোবাসেন তিনি।
প্রতিদিনের মত সেদিনও গাছগুলোয় পানি দিতে দিতে ঝরা বেলীগুলো কুড়িয়ে ছোট্ট পেয়ালায় সাজিয়ে সদর দরজার তালাটা খুলে ভেজিয়ে দিলেন পাল্লাটা। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঠিকা কাজের বুয়াটা এসে পড়বে। রান্নাঘরের জানালাটা খুলে চুলোটা অন করলেন। ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের মগ হাতে বারান্দার সিঁড়িতে এসে বসলেন মুড়ি মাখানো বাটিটা হাতে। এই সময়টুকু নাজমা বেগমের একান্ত নিজের। সুখ দুঃখের ডালা খুলে বসেন। আপন মনে নাড়াচাড়া করেন। নিভৃতে চোখের পানি ফেলেন। তারপর সারাটা দিন কাটে সংসারের ব্যস্ততায়, হাসি কান্নার ফুরসত কোথায় আর?
হাসতেতো ভুলে গেছেন সেই কবে। সময় পেলে কান্নাতেই ভাসেন সবার অগোচরে। অগোচরেই কাঁদতে হয়, এ কান্না যে লজ্জার।
কদিন আগে যদিও স্বস্তির একটা বিষয় ঘটেছে। বুকের মাঝে বিঁধে থাকা কাঁটাটার ব্যাথার উপশম হয়েছে, উপড়াতে পারেননি। পারবেনও না। মাতৃস্নেহ কিংবা পিতৃস্নেহটাও একটা সাগর।জগতের সব কিছু ধুয়ে যেমন সাগরে গিয়ে মিশে যায়, বাবা মায়ের হৃদয়টাও তেমনি দূর্বল জায়গা। সন্তানের দেয়া কষ্ট দুঃখ লাজ অপমান সব কিছুই মিশিয়ে ফেলে, সন্তানের অসহায় পরাজিত কষ্ট দগ্ধ মুখটা একবার দেখলে সব কিছু ভুলে গিয়ে সাগর সমান বিশাল হৃদয়ে ঠাঁই দেন বার বার।
অথচ বছর চার আগেও নাজমা বেগমের সাজানো গোছানো সংসার দেখে আশেপাশের প্রতিবেশীরা, স্বজনেরা খানিকটা ঈর্ষাই করতো। হিমু হাইস্কুলে বড় ক্লাশে ওঠাবার পর নাজমার ছুটোছুটিটা কমে গিয়েছিল অনেকটা। প্রাইভেট টিউটর আর কোচিং এর দৌড়ঝাঁপটা হিমুর একার উপরেই ছেড়ে দিয়েছিলেন ক্লাশ নাইনের পর থেকে। দিনগুলিতে ছিল নানা বৈচিত্র।
নাজমার বাবার বাড়ি কিছুটা দূরে, অন্য শহরে। মা নেই, ভাই বোনদের আপন আপন সংসার।
নাজমার সময়গুলো এ বাড়ির আনন্দে, এ বাড়ির আবর্তেই বেশ কেটে যেতো এতদিন স্বামী সংসার আর সন্তানদের নিয়ে। কোন অভিযোগ ছিল না চার দেয়ালের ওপারে মুক্ত স্বাধীন হয়ে ঘুরবার।
এই ঘরকুনো অভ্যেসটাই হয়তো তাকে বর্তমানের অনেক কিছুই জানতে দেয়নি কিংবা অজ্ঞ করে রেখেছিল।
চা খাওয়া শেষ করে মগটা একপাশে রেখে পানির পাইপটা ট্যাপের মুখে লাগিয়ে অপর প্রান্ত দিয়ে সিক্ত করতে থাকেন দেয়াল ঘেঁষে থাকা ফুল আর সব্জির ছোট্ট বাগানটা।
বছর চারেক আগে এ সময়টা কাটাতেন বাড়ির অনতিদূরের ঐ পার্কে হেঁটে বেড়িয়ে। প্রতিবেশি ভাবীরাতো বটেই দূর পাড়ার জনা কয়েক বান্ধবীও জুটে গিয়েছিলো এই সুত্রে। জমজমাট আড্ডা বসতো ছুটির সকালগুলোতে। বাচ্চাদের স্কুল বা কোচিং এর সাপ্তাহিক ছুটি, কর্তার অফিস বন্ধ। বেলা করে ঘুমান পড়ে পড়ে। আর ছেলেও ক্লাশ টেনে ওঠার পর নিয়ম পাল্টেছে। দিনভর প্রাইভেট, স্কুল, কোচিং এ ছুটোছুটি আর রাত হলে নাকে মুখে দুটো খেয়ে মুখ গুজে পড়ার টেবিল। অনর্গল কথার খই ফোটা ছেলেটি যেন পড়ার চাপে পাল্টে যেতে থাকলো হঠাৎই।
নাজমা প্রথমটায় একটু আপত্তি জানালেও ছেলের পড়ার অগ্রসর শুনে মানিয়ে নিয়েছিলেন।
পার্কে হাঁটার সাথী ছিলেন নাজমার বাড়ির ঠিক বিপরীতের বাড়িটির গৃহিনী। প্রতিবেশি এবং সম্পর্কে সমবয়সী এক মামী। ভারি উচ্ছল আর প্রাণবন্ত মামী মানুষটি নাজমার মনের মত একেবারে। এ বাড়ি ও বাড়ির খাবার মেনুর অবাধ যাতায়াত ছিলো দু বাড়ির মধ্যে।
মামীর মেয়ে নুশাইবা ছিল হিমুর সহপাঠি।পড়তো ভাল স্কুলে। নাজমা খেয়াল রাখতো ওর পরীক্ষার প্রশ্ন বা গাইডগুলোর সহযোগীতায় হিমুকে এক ধাপ এগিয়ে নিতে।
একসময় ওরা নিজেরাই লেখাপড়ার লেন দেন করতে শুরু করলো। ওদের খালা ভাগনের বন্ধুত্বের যৌথ সহযোগে সামনের ফাইনাল পরীক্ষা চরম সফলতা আনবে এমনটাই আশা জাগিয়েছিল নাজমা এবং মামী দুজনেরই বিশ্বাসে।
পরীক্ষাটা একসময় শেষও হলো ভালয় ভালয়। নাজমা নিশ্চিন্ত হয়ে যেই গায়ে একটু হাওয়া লাগাবেন বলে আয়েশ করে শুয়ে দুপুরের ভাতঘুমটা দিয়েছেন, অমনি ডোর বেলে মুর্হুমুহু “টি টং টিং টং” আওয়াজে চোখ মেলে দেখেন চারপাশ আঁধারে ঘেরা। গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিলেন এতটা সময়। সুইচ অন করে ঘরের আলোটা জ্বালিয়ে মেইন গেটটা খুলে দেন।
—– কি ব্যাপার? অফিস থেকে ফিরে কারো সাড়া শব্দ না পেয়ে একটু ঘাবড়ে গেলাম বাড়ি এত সুমসাম দেখে। ভাবলাম মা ছেলে পরীক্ষা শেষে ঘুরতে বেরুলে নাকি বাড়ি লক দিয়ে।
—– ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হিমু দুপুরে খেয়ে সেই যে বেরুলো এখনও ফিরে নি, নাকি বেল টিপে আমার সাড়া না পেয়ে মামীর বাড়িতেই আড্ডা দিচ্ছে এখনও।
—– তাই হবে। খুব ধকল পোহালো পড়ালেখার। কটাদিন রিল্যাক্সে থাক।তারপর আবারতো শুরু হবে পড়াশুনার জোয়াল কাঁধে নিয়ে ছুটাছুটি।
সন্ধ্যার চায়ের টেবিলেও হিমু এলো না যখন, হিমুর বাবা টিভিটা অন করে বললেন, ভাল্লাগছেনা ফাঁকা ফাঁকা। নাজমা তুমি বরং মামীর বাসায় গিয়ে হিমুকে ডেকে আনো। অনেকদিন পর একসাথে খেলা দেখবো বাপ বেটা।
নাজমাও এমনটাই ভাবছিলেন। খোলা চুলগুলো হাত খোপায় জড়াতে জড়াতে সিঁড়িতে রাখা স্যান্ডেলে পা গলিয়ে দরজাটা ভিড়িয়ে এগিয়ে গেলেন ওবাড়ির উদ্দেশ্যে।
অকল্পনীয় অপ্রত্যাশিত ঘটনায় ফিরে এলেন তক্ষুনি কোনমতে নিজেকে ঠিক রেখে। চেস্টার ড্রয়ারে চাবি খুঁজে পেলেন না। ঐতো আলমারিতেই ঝুলছে। সশব্দে পাল্লা খুলে ছোট ড্রয়ার হাতড়ে দেখেন খামটা নেই।
ডালা খোলা ছোট্ট অর্নামেন্ট বক্সটারও।
ধপ্ করে বসে পড়েন বিছানায়।
” সর্বোনাশ হয়ে গেছে হিমুর বাবা।
হিমুর বাবার মাথায় বজ্রাঘাত ঘটিয়ে নাজমা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
হিমু নেই। নেই নুশাইবাও। দুপুরেই পালিয়েছে ওরা।
—- মানে? তুমি কি বলছো, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝেনি কেউই। সবে স্কুল পেরুনো অসম সম্পর্কের মায়ের আঁচলে মুখ লুকানো ছেলে মেয়ে দুটি কখন এতটা বুদ্ধি জমিয়েছে, এতটা পরিপক্ক হয়েছে বুঝতে পারে নি যেমন হিমুর মা বাবা, বুঝতে পারে নি নুশাইবার মা বাবাও। নুশাইবা ওর মাকে চিঠি লিখে রেখে গেছে,
মা,
আমি আর হিমু চলে যাচ্ছি অনেকদূরে। কারন আমরা দুজন দুজনকে ছাড়া থাকতে পারবো না। কিন্তু তোমরা কেউ আমাদের এমন উল্টা পাল্টা সম্পর্কটা মেনে নিবে না জানি। মানা যায় না তাও জানি। আমাদের খুঁজো না। আমরা ভালোই থাকবো।
নুশাইবা।
চিঠিটা ছিল ওর পড়ার টেবিলেই ক্যালকুলেটরে চাপা দেয়া। ওদের যাওয়ার কতক্ষন পরে হবে তা অনুমান করা না গেলেও খুব বেশি সময় যে পার হয়নি এটা নিশ্চিত। এক দন্ড সময় নষ্ট না করে নুশাইবার বাবা মন খারাপ করবার মত সময়টুকুও না নিয়ে ত্বরিত গতিতে চারিদিকে লোক লাগিয়ে দিয়েছেন ওদের ধরে আনতে। প্রতিটি ষ্টেশন টার্মিনালে পুলিশ চেকিং ও বাদ রাখেন নি। কিন্তু কি আশ্চর্য ওদের কোন হদিস করতে পারলো না কেউ। যেন মিলিয়ে গেল বাতাসে জলজ্যান্ত ছেলেমেয়েদুটো। এক মাস দু’ মাস। বছরও পার হলো। পেরুলো একে একে চারটি বছর।
নুশাইবার বাবা মার সাথে তারপর থেকে আর কখনই মুখোমুখি হয়নি নাজমা। হয়তো ওরা অনুসন্ধান অব্যাহত রেখেছে বছরের পর বছর।কিন্তু নাজমা বা ওর স্বামী একটিবারের জন্যও খোঁজ করে নি হিমুর। যে নিজেই হারিয়ে যায় তাকে খুঁজলেই কি পাওয়া যায়? এমন অকৃতজ্ঞ নরাধম ছেলের জন্য এ বাড়ির দরজা বন্ধ চিরতরে। লজ্জা লজ্জা। কতদিন মুখ তুলে হাঁটতে পারেননি হিমুর বাবা। কারও সাথে যোগাযোগও রাখেন নি সামাজিকতার। আর নাজমা গুটাতে গুটাতে লোকচক্ষুর আড়ালেই নিজেকে ঢেকে ফেললো। কিন্তু মন? অবাধ্য মন, ছুটে চলে দিক বিদিক। হিমুর ছোট্ট ঘরটায় বিছানায় গিয়ে বসেন। বেডকভারে হাতের পরশ বুলান। হ্যাঙ্গারে ঝোলানো শার্ট, জ্যাকেটের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকেন। পড়ার টেবিলে বসে থাকেন একটানা।অবচেতনে শুনতে পান হিমুর ডাক,মা কোথায় তুমি? আমাদের প্রাকটিকাল ক্লাশ শেষ মা। মা আজ কি মেনু দুপুরের। মাগো দুশোটা টাকা দিতে পারবে, বন্ধুরা মিলে বাইরে খাবো আজ।
দু’ চোখ জ্বালা করে ওঠে নাজমার। মাথাটা ঝিম ধরে। তারপর আর কিছু মনে থাকে না।
হিমুর বাবা মনকে শক্ত করেন। নিজেকে স্বান্তনা দেন। জীবনটাকেতো ঐ অকৃতজ্ঞ অমানুষ ছেলেটার জন্য শেষ করে ফেলা যাবে না। যতদিন বাঁচার কোটা নির্ধারিত ততদিনতো টিকে থাকতে হবে।
নাজমার হাত নিজের মুঠিতে শক্ত করে ধরেন। চলতে শেখান নিজের মত করে। সময় দুহাতে ঠেলে পার করা নয়, সময়কে সময়ের সাথেই পেরুতে হয়।
সেই থেকে নাজমার শুন্য উঠোন ভরে ওঠেছে এক এক করে সবুজে সবুজে।
সব গাছগুলোয় পানি দিয়ে যখন ফিরলেন পাইপটা খুলতে গিয়ে দেখেন উঠোনের দরজাটা হাট করে খোলা । নিশ্চয় বুয়া ঢুকে দরজাটা লাগাতে ভুলে গেছে।
—– ওটা কি? এগিয়ে গেলেন জিনিসটাকে লক্ষ্য করে। আবার দুপা পিছিয়ে এলেন আৎকে ওঠে।কাঁথায় কাপড়ে জড়ানো শিশু যে। বয়স মাস তিনেকের হবে হয়তো। সদ্য ঘুম ভাঙ্গা চোখে তাকিয়ে আছে। কান্নার পুর্বাভাস কচি ঠোঁট দুটিতে।
কোলে তুলে নেন অবাক বিস্ময়ে। বুয়া এসে পড়ায় নাজমা যেন অথৈ জলে খড় কুটা ধরার অবলম্বন পান।
হৈ হৈ করে বলে ওঠেন—- দেখেছো কান্ড আকাশ থেকে পড়ার মত বাচ্চাটা এখানে এলো, আমি টেরটিও পেলাম না।
বুয়া গভীর কৌতুহল নিয়ে নাজমার কাছে এসে। গলা নামিয়ে বলে, —- আকাশ থেকে নয় খালা। ঘরের ছেলে ঘরে এসেছে। দরজার ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে, দেখেন।
নাজমা ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন এক মুহূর্ত। ত্বরিত গতিতে দরজা পেরুতেই দেখলেন, দ্রুত গতিতে সামনে বাড়ির গেটে ঢুকে গেল অনেক চেনা মানুষটি। “নুশাইবা” জোরে ডাকতে গিয়েও থেমে গেলো নাজমার কন্ঠস্বর।
সবটুকু শক্তি হারিয়ে কোনমতে বুয়ার কোলে বাচ্চাটাকে দিয়ে উঠানের সিঁড়িতে বসে পড়লেন নাজমা পিলারে মাথাটা এলিয়ে।
তার স্বরে কাঁদতে লাগলো বাচ্চাটা বুয়ার কোলে।
ততক্ষণে জেগেছে কদিন আগে ফিরে আসা হিমু। জেগেছেন ওর বাবাও। এগিয়ে এসে
নাজমার কপালে হাত রেখে বললেন, এভাবে বসে আছো কেন? শরীর খারাপ লাগছে? ঘরে চলো শোবে।
সামনে দাঁড়ানো বুয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, এই সকালে বাচ্চা নিয়ে কেন, বাসায় রেখে এসো। নাস্তা বানাতে হবে। দেখছো না তোমার খালার শরীর ভাল নেই।
ঘরের জানালায় দাঁড়ানো হিমু একছুটে বুয়ার কোল থেকে বাচ্চাটিকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলো।
—- বাবা, ও কোথাও যাবে না বাবা। ওর কোথাও যাবার জায়গা নেই যে।
এ যেন চোখের সামনে একটু একটু করে বেড়ে ওঠা বাবা মায়ের সেই হিমু নয়,অন্য কেউ। এক নাগাড়ে মেলে ধরলো বিগত চার বছরের দিনগুলি একের পর এক।
অপরিণত বয়স, অন্ধ মোহ আর অদূরদর্শী জ্ঞান নিয়ে অনেক চড়াই উৎরাই পথ পেরিয়ে দূর শহরের ভীড়ে মিশে ছিল ওরা প্রথম কিছুদিন। কাজী অফিসে বিয়েটা বাধ সাধলো যখন বয়স কমের কারনে। তখন স্হানীয় হুজুরের মাধ্যমে বিয়ের কবুল পড়ে দুজনে।
মায়ের গয়না চুরির টাকা আর খামে সঞ্চিত টাকায় বস্তিতে শুরু হয় সংসার। দিনভর এটা ওটা কাজের বিনিময়ে চলে দুটি জীবন যাপন। তিন বছরের মাথায় নতুন অতিথির আগমনি সূচনায় দিশেহারা হয়ে পড়ে ওরা। কাজে যেতে অপারগ নুশাইবা। হিমুর একার অস্হায়ী আয় মেটাতে পারে না চাহিদা দৈনন্দিন হিসাবের। বস্তিবাসীদের সহায়তায় জন্ম নেয় ফুটফুটে সন্তান। কিন্তু দিন কাটে অনেক কষ্টে। অবর্ণনীয় অভাবে জর্জরিত হতে থাকে তিনটি প্রাণী। নিজেদের কষ্টগুলো চোখের পানিতে সয়ে নিলেও বাচ্চার কষ্টে অস্হির হয়ে পড়ে ওদের সদ্য বাবা মা হওয়া অনভিজ্ঞ দুটি মন। প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করে নিজেদের বাবা মাকে দেয়া অসহনীয় যন্ত্রণা।
বাবা মাকে দেয়া অপমান আর লজ্জার চপেটাঘাত করে অহরহ, হৃদয় রক্তাত হয় পলে পলে। বিস্ময়ের সাথে খেয়াল করে দুজনের প্রতি দুজনার সেই মোহ আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। শুধু একটা জায়গায় ওদের ভালোবাসা স্হির। তা হলো সন্তানটির প্রতি সীমাহীন মায়া।
অভাবের সাথে পরাজিত হয়ে পুরো চার ছর পর
নুশাইবা ওর মায়ের সাথে যোগাযোগ করে ফোনে। মা শর্ত দেন হিমুকে মানতে পারবেন না তারা কখনই। ওকে ত্যাগ করে ফিরতে পারলে দুয়ার খোলা সব সময়।
হিমুও যেন জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত হয়ে এমনটিই চাইছিলো। নুশাইবাকে কিছু না বলে না কয়ে উধাও হয়ে যায় একদিন। পথে পথে ঘুরে। এ শহর ও শহর। ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে ভাবে, নাহ আর ফিরবে না ঐ অনিশ্চিতের দিকে।
নুশাইবা ওর মাকে নিশ্চয় ফোন করবে, মায়ের কাছে ফিরে যাবে বাবুকে নিয়ে। অনেক যত্নে থাকবে সোনামনিটা। হিমু ওদের কাছে থাকলে ওদের কষ্ট কোনদিন ফুরাবে না।
পরাজিত সৈনিক অবশেষে ফিরে আসে মা বাবার কোলেই। যে কোলকে লজ্জা অপমান আর যন্ত্রনায় দগ্ধ করে দু’ পায়ে দলিয়ে মাড়িয়ে চলে গিয়েছিল একদিন হিমু।
নাজমা ওঠে দাঁড়ান স্বামীর বাড়ানো হাতে ভর দিয়ে। বুয়াকে উদ্দেশ্য করে বলেন, দরজাটা বন্ধ করে দাও বুয়া, নুশাইবাকে আমরাও মানতে পারবো না। হয়তো আমাদের মন ভুলিয়ে বাবুকে নিতে আসবে।
হাসে বুয়া। পান খাওয়া লাল দাঁতগুলি বের করে খিস্তি করে বলে ওঠে,
—— আহারে খালা এখনও বুঝতে পারলেন না। আমি ওদের বাড়িতেও কাজে যাই। বাবুটাকে এতিম খানায় রেখে নুশাইবাকে আবার বিয়ে দিবে ওরা।নুশাইবা আমাকে বলেই এই বুদ্ধি টা করেছে। বাবুকে এতিমখানায় দিতে চায় না, মায়ের মন। নুশাইবা কেঁদে কেঁদে এসবই আমাকে বলেছে। আর একটু আগে আমার সাথেই এসেছিলো বাবুকে চুপ করে রাখতে।
হিমুর কাছ থেকে ওর বাবা বাচ্চটাকে নিয়ে নাজমার কোলে তুলে দিয়ে বলেন, একবার যেমন সমস্ত লজ্জা অপমান অবজ্ঞা হজম করেছিলে প্রিয়জনকে হারিয়ে আজ আবারো সেই লজ্জা অপমান আর সমাজের ভ্রুকুটি সইবার জন্যে প্রস্তুত হও আর এক প্রিয়জনকে গ্রহন করে।
নাজমা অশ্রুসিক্ত চোখ না মুছেই জল টলমল দৃষ্টিতে এবার ভালোভাবে তাকান ছোট্ট পুতুল পুতুল বাচ্চাটার দিকে। একুশ বছর আগের প্রথম সন্তান কোলে নেয়ার মতই সেই আনাড়ি হাত দুটোর কাঁপা কাঁপা অনুভুতি যেন। আর ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকা চোখ দুটোতে সেই চেনা পরশ। ছোট্ট দুটি টানা চোখে এক্কেবারে ছোট্ট হিমুর চাহনি।
Fahmida Reea
Send private message to author




